পৌষের শীতল সকালে গ্রামাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠে চোখে পড়ে ধানগাছের অবশিষ্টাংশ বা গোড়া, স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় ‘নাড়া’। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাগো নিউজে প্রকাশিত কামরুল হাসান হৃদয়ের এক ফিচারে উঠে আসে এই নাড়ার গল্প: ধান কেটে নেওয়ার পর মাঠজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা নাড়া নীরবে জানিয়ে দেয়, কৃষিবর্ষের আরেকটি অধ্যায় শেষ হলো। পৌষ বাংলা বর্ষপঞ্জির নবম মাস, যা পড়ে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি জুড়ে।
বাংলাদেশে বছরে ধানের তিনটি মৌসুম: আউশ, আমন ও বোরো। আমন ধান সাধারণত জুলাই-আগস্টে রোপণ করে নভেম্বর-ডিসেম্বরে কাটা হয়। এই ধান পুরোপুরি বৃষ্টিনির্ভর, আর ধানের মৌসুমগুলোর মধ্যে আমনের জমিই সবচেয়ে বেশি। তাই শীতের শুরুতে দেশের বহু মাঠ ভরে থাকে আমনের নাড়ায়।
খড়ের ঘর থেকে ইট-সিমেন্টের বাড়ি
একসময় এই নাড়া ও খড় ছিল গ্রামীণ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। ধানগাছের খড় দিয়েই তৈরি হতো খড়ের ঘর, বর্ষা, গ্রীষ্ম ও শীত সব ঋতুতেই সেসব ঘরে কাটত মানুষের জীবন। সময়ের পরিবর্তনে খড়ের ঘর আজ বিলুপ্তপ্রায়, গ্রামেও উঠেছে ইট-সিমেন্টের ভবন। তবু নাড়া এখনো টিকে আছে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিজীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে।
খড় হলো দানা ও তুষ ছাড়িয়ে নেওয়ার পর ধান, গম, যবের মতো দানাশস্যের শুকনো কাণ্ড। দানাশস্যের মোট ফলনের ওজনের প্রায় অর্ধেকই খড়। জ্বালানি, গবাদিপশুর খাদ্য ও বিছানা, ঘরের ছাউনি আর ঝুড়ি বানানোসহ নানা কাজে খড় ব্যবহৃত হয়।

পরের ফসল আর গোখাদ্যের জোগান
কৃষি বিভাগ সূত্রের বরাতে ফিচারে বলা হয়, অধিকাংশ কৃষিজমিতে এখনো ধানই প্রধান ফসল। ধান ঘরে তোলার পর কৃষকেরা কিছুদিন জমিতে নাড়া রেখে দেন, তারপর চাষ দিয়ে জমি প্রস্তুত করেন পরের ফসলের জন্য। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এসব জমিতে অন্য ফসলের চাষ হয়, আর এই ধারাবাহিক চাষাবাদই সচল রাখে গ্রামীণ অর্থনীতি।
নাড়া থেকে পাওয়া খড় গরু ও ছাগলের প্রধান খাদ্য। অনেক খামারি নাড়া সংগ্রহ করে খড়ের পালা বানিয়ে সারা বছর সংরক্ষণ করেন। খড়ের বাজারদর বাড়লে এই নাড়া কৃষকের বাড়তি আয়ের উৎসও হয়ে ওঠে।
গবেষণাতেও খড়ের এই গুরুত্ব ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) গবেষকেরা পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নীলফামারী ও সাতক্ষীরার ৪০ জন দুগ্ধ খামারির কাছ থেকে তথ্য নিয়ে ২০২৪ সালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। তাতে দেখা যায়, গাভিকে দেওয়া আঁশজাতীয় খাদ্যে ধানের খড়ের অংশ প্লাবনভূমি এলাকা নীলফামারীতে ছিল সবচেয়ে বেশি, ৭৫ শতাংশ, আর খরাপ্রবণ চাঁপাইনবাবগঞ্জে সবচেয়ে কম, ৪৫ শতাংশ। গবেষকেরা লেখেন, রোমন্থক প্রাণীর খাদ্যের বড় অংশই আঁশজাতীয় খাদ্য।
খড় পুড়িয়ে ফেলারও চল আছে কোথাও কোথাও। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় লেখেন, ধানের খড় খোলা জায়গায় পোড়ালে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়; তাঁরা গোবর ও মুরগির বিষ্ঠার সঙ্গে খড় মিশিয়ে বায়োগ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা পরীক্ষা করেন।

আগুন পোহানো, জিলাপি আর গোলাভরা ধানের স্মৃতি
পৌষের শীতের সঙ্গে নাড়া ঘিরে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ জনপদের বহু স্মৃতি। একসময় শীতের সকাল ও সন্ধ্যায় নাড়া কেটে জড়ো করে আগুন পোহানো ছিল গ্রামবাংলার চেনা চিত্র। সেই আগুন ঘিরেই বসত গল্পের আসর, আলোচনায় আসত হাটের খবর, ফসলের হিসাব আর গ্রামের সুখ-দুঃখ।
প্রবাসফেরত মো. রাকিব মিয়া জানান, শৈশবে সকাল-সন্ধ্যা নাড়া কেটে আগুন পোহানো ছিল তাঁদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। শহরের যান্ত্রিক জীবনে সেই উষ্ণতা আর মেলে না; মাঠে দাঁড়িয়ে নাড়া দেখলেই তাঁর চোখে ভেসে ওঠে শৈশবের দিনগুলো।
সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বছর পাঁচেক আগেও ধান কাটার পর ইঁদুরের গর্ত থেকে পড়ে থাকা ধান কুড়িয়ে বিক্রি করতো গ্রামের শিশুরা। তখন বেপারিরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধানের ওজনে জিলাপি দিতো। সঙ্গে থাকতো রসপোয়া ও গুলগুলা। এই ছোট ছোট আনন্দই ছিল গ্রামীণ শৈশবের বড় পাওয়া।’
কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, ‘চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো স্বচ্ছলতা নেই। একসময় গোলাভরা ধান থাকতো। নিজেদের খাওয়ার পরও বিক্রি করা যেত। এখন অনেক সময় পরিবারের খাবার নিশ্চিত করতেই হিমশিম খেতে হয়।’

কৃষিসংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষিপদ্ধতি আধুনিক হওয়ায় খড়ের ঘর হারিয়ে গেলেও নাড়া এখনো গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এটি একদিকে কৃষকের উৎপাদনের অংশ, অন্যদিকে পশুপালনের অবলম্বন। পৌষের শেষে জমি আবার চাষ হলে নাড়া মিশে যায় মাটির সঙ্গে, আর মাঠে ওঠে নতুন ফসল।
ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা (জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল রিসার্চ, ২০২৪), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা (হেলিয়ন, ২০২৫), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)