২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের মাঠে মাঠে সূর্যমুখী ফুটে ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে সেই মৌসুমে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইলে ৩,১০০ হেক্টর জমিতে এ ফসলের চাষ হয়। বটিয়াঘাটার এক কৃষক রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেন, তিনি এক বিঘা পতিত জমিতে সূর্যমুখী বুনেছেন এবং ফলন ভালো হয়েছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে, ডিএইর এক প্রকল্প পরিচালক মংগাবেকে বলেছিলেন, পতিত ও লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী চাষ করে দেশের রান্নার তেলের চাহিদার ২৬ শতাংশ পর্যন্ত মেটানো সম্ভব।
এই ফসল পরিচিতিতে জানা যাবে সূর্যমুখী কী, বাংলাদেশে কেন তেলের জন্য এর চাষ হয়, এর খৈল, মাথা ও গাছ কী কাজে লাগে, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) জাত কিরণী ও বারি সূর্যমুখী-২ কেমন, সঙ্গে নতুন জাত বারি সূর্যমুখী-৩। বারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় পাওয়া মাটি, মৌসুম, বীজের হার ও পরিচর্যা, গবেষকদের হিসাবে খরচ ও আয়, এবং কৃষক কোথায় পরামর্শ পাবেন, তা-ও এখানে আছে। প্রতিটি সংখ্যা ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকাশিত সূত্রে যেভাবে আছে, সেভাবেই দেওয়া হলো।
সূর্যমুখী গাছ: পরিচয় ও উৎপত্তি
সূর্যমুখীর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Helianthus annuus; এটি অ্যাস্টারেসি (Asteraceae) গোত্রের উদ্ভিদ। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সেবার (ইউএসডিএ এনআরসিএস) উদ্ভিদ নির্দেশিকা জানায়, গণের নামটি এসেছে গ্রিক হেলিওস ও অ্যান্থোস শব্দ থেকে, যার অর্থ "সূর্য ফুল"; আর annuus মানে "একবর্ষজীবী"। নির্দেশিকায় গাছটিকে বলা হয়েছে খাড়া, শক্ত, প্রধান মূলবিশিষ্ট একবর্ষজীবী উদ্ভিদ; এর কাণ্ড খসখসে ও লোমশ, চারপাশে হলুদ পাপড়ির মতো রশ্মি ফুল আর মাঝখানে লালচে বাদামি চাকতি ফুল।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, হলুদ রশ্মিযুক্ত পুষ্পমঞ্জরি কখনও কখনও ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হয়, আর চাষের সূর্যমুখীর উৎপত্তি সম্ভবত মেক্সিকোতে। ইউএসডিএ নির্দেশিকা যোগ করে, উত্তর আমেরিকার আদিবাসীরা গাছটিকে পোষ মানান এবং গত ৩,০০০ বছরে বারবার সবচেয়ে বড় বীজ বেছে নিয়ে বীজের আকার প্রায় ১,০০০ শতাংশ বাড়িয়েছেন। সূর্যমুখী সম্ভবত মেক্সিকো থেকে স্পেনে, সেখান থেকে ইউরোপের অন্যান্য দেশে যায়। পরে রুশ চাষিরা ম্যামথ রাশিয়ান বা রাশিয়ান জায়ান্ট ধরনটি তৈরি করেন, যার বীজ ১৮৯৩ সালে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যায়।
বাংলাদেশে সূর্যমুখী প্রথমে এসেছিল বাগানের ফুল হিসেবে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে তেলবীজ ফসল হিসেবে চাষের জন্য কিছু খাটো জাত আনা হয়, এবং দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় খরিপ ও রবি দুই মৌসুমেই এর চাষ শুরু হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ফলন হেক্টরে প্রায় ৭৬০ কেজি, আর ফসল তুলতে লাগে প্রায় ৯০ থেকে ১১০ দিন। ২০২৩ সালে ইবাউব জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা আগের গবেষণার বরাতে জানায়, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র কৃষকেরা ১৯৭৫ সাল থেকে সূর্যমুখী চাষ শুরু করেন।

বাংলাদেশে তেলের জন্য সূর্যমুখী কেন
বাংলাদেশে সূর্যমুখী চাষের মূল যুক্তি ভোজ্যতেলের ঘাটতি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের গবেষকদের ইবাউব জার্নালে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত গবেষণাটি আগের গবেষণার বরাতে জানায়, দেশে বছরে ১.৬ মিলিয়ন টন চাহিদার বিপরীতে ভোজ্যতেল উৎপাদন হয় ০.৩৫৮ মিলিয়ন টন, আর বাকি ১.২৪২ মিলিয়ন টন আমদানি করে মেটানো হয়। একই গবেষণাপত্র অনুযায়ী, মাথাপিছু ভোজ্যতেল গ্রহণ ২০১৬ সালের ১৫.৩ কেজি থেকে বেড়ে ২০২০ সালে ১৮.৪ কেজিতে দাঁড়ায়; দেশের ৩০.৩ লাখ টন তেল ও চর্বির ৯২ শতাংশই আমদানি করা; আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২.১২ বিলিয়ন ডলারের ২৭.৭৩ লাখ টন ভোজ্যতেল, চর্বি ও তেলবীজ আমদানি করে।
২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি মংগাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ভোজ্যতেল চাহিদার মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, আর প্রায় ৮,০০,০০০ হেক্টর জমির তেলবীজ থেকে উৎপাদন হয় প্রায় ১.২ মিলিয়ন টন। ডিএইর ভোজ্যতেল ফসল প্রকল্পের পরিচালক জসিম উদ্দিন মংগাবেকে বলেন, সূর্যমুখী থেকে ভালো মানের তেলবীজ উৎপাদন করা গেলে ভোজ্যতেলের আমদানিও কমানো যাবে; চাহিদার ১০ শতাংশ এখন দেশে উৎপাদিত হচ্ছে, আরও ১৬ শতাংশ উৎপাদন করা গেলে চাহিদার ২৬ শতাংশ মেটানো যাবে।
সূর্যমুখীর বীজে তেল অনেক। মূল ফসল পরিচিতিতে বারির দুই প্রধান জাতের বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৪২ থেকে ৪৪ ভাগ উল্লেখ করা হয়েছে, আর মংগাবে বীজে তেলের পরিমাণ লিখেছে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। ইবাউব জার্নালের গবেষণাপত্র প্রকাশিত পর্যালোচনার বরাতে জানায়, এক কেজি সূর্যমুখী বীজ থেকে ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম তেল পাওয়া যায়, এবং এর তেলে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি, যার মধ্যে বহু-অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। মূল পরিচিতিতে বলা হয়েছে, বীজে লিনোলিক অ্যাসিড আছে। বাংলাপিডিয়া যোগ করে, বনস্পতি বা উদ্ভিজ্জ ঘি তৈরিতে চীনাবাদামের তেলের বদলে এই তেল ব্যবহার করা যায়, এবং এতে ভিটামিন এ, ডি ও ই আছে। হৃদরোগ বা অন্য কোনো অসুখ থাকলে রান্নার তেল বা খাদ্যাভ্যাস বদলানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শুধু তেল নয়: খৈল, মাথা ও গাছ
সূর্যমুখী ফসলের খুব সামান্য অংশই নষ্ট হয়। মূল পরিচিতি জানায়, তেল বের করার পর যে খৈল থাকে, তা গরু ও মহিষের উৎকৃষ্ট খাদ্য; বাংলাপিডিয়াও খোসা ছাড়ানো চাপা খৈলকে গবাদিপশুর খাদ্য এবং বীজকে হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। বীজ ছাড়ানোর পর খালি মাথাগুলোও গরুকে খাওয়ানো যায়।
শুকনো গাছ ও পুষ্পস্তবক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইউএসডিএ নির্দেশিকায় অন্যান্য দেশেও একই ব্যবহারের কথা আছে: সূর্যমুখীর ডাঁটা জ্বালানি, গবাদিপশুর খড়, হাঁস-মুরগির খাদ্য ও সাইলেজ হিসেবে কাজে লেগেছে, আর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পোড়ানো ডাঁটার ছাই আবার মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। বীজ জলখাবার হিসেবে খাওয়া হয় এবং পাখির খাবার হিসেবে বিক্রি হয়; ফুলের সৌন্দর্যের জন্য শোভাবর্ধক গাছ হিসেবেও এর চাষ হয়, বাংলাদেশে যেভাবে এর প্রথম আগমন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, বাগেরহাটের ফকিরহাটে এক সূর্যমুখী খেত শুধু দেখার জন্যই দর্শনার্থীরা আসছিলেন।
বারির সূর্যমুখী জাত: কিরণী, সূর্যমুখী-২ ও সূর্যমুখী-৩
মূল ফসল পরিচিতিতে বারির প্রথম অবমুক্ত দুটি সূর্যমুখী জাতের বর্ণনা আছে। নিচের সংখ্যাগুলো পরিচিতিতে দেওয়া বারির জাত-বর্ণনা অনুযায়ী।
- কিরণী (ডিএস-১): ১৯৯২ সালে অনুমোদিত, বাছাই প্রক্রিয়ায় উদ্ভাবিত। কাণ্ডের ব্যাস ১.৫ থেকে ২.০ সেন্টিমিটার; পরিপক্ব পুষ্পমঞ্জরির ব্যাস ১২ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার; প্রতি মাথায় ৪০০ থেকে ৬০০ বীজ; বীজের রং কালো; ১,০০০ বীজের ওজন ৬৮ থেকে ৭২ গ্রাম; বীজে তেল শতকরা ৪২ থেকে ৪৪ ভাগ। অল্টারনারিয়া ব্লাইট রোগ মোটামুটি সহনশীল। জীবনকাল ৯০ থেকে ১১০ দিন; হেক্টরপ্রতি ফলন ১.৬ থেকে ১.৮ টন।
- বারি সূর্যমুখী-২: কাণ্ডের ব্যাস ২.০ থেকে ২.৪ সেন্টিমিটার; পরিপক্ব পুষ্পমঞ্জরির ব্যাস ১৫ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার; বীজের রং কালো; ১,০০০ বীজের ওজন ৬৫ থেকে ৭০ গ্রাম; প্রতি মাথায় ৪৫০ থেকে ৬৫০ বীজ; তেল শতকরা ৪২ থেকে ৪৪ ভাগ। জীবনকাল রবি মৌসুমে ৯৫ থেকে ১০০ দিন এবং খরিপ মৌসুমে ৯০ থেকে ৯৫ দিন; হেক্টরপ্রতি ফলন রবিতে ২.০ থেকে ২.৩ টন এবং খরিপে ১.৫ থেকে ১.৮ টন।
বড় মাথা আর রবি মৌসুমে বেশি ফলনের কারণে মাঠ গবেষণায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে বারি সূর্যমুখী-২। ২০১২-১৩ রবি মৌসুমে গাজীপুরের জয়দেবপুরে বারির খামারে এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বারির আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষা চালানো হয়, যার ফল ২০১৫ সালে বাংলাদেশ অ্যাগ্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত হয়। সেখানে ২০ নভেম্বর বোনা বারি সূর্যমুখী-২ গাছের উচ্চতা ছিল ১৭২.১৩ সেন্টিমিটার, মাথার ব্যাস ১৮.৩৩ সেন্টিমিটার, প্রতি মাথায় বীজ ৬৬ গ্রাম, ১,০০০ বীজের ওজন ৬৮ গ্রাম, আর ফলন হেক্টরে ২.৫ টন।
একই জার্নালে ২০২০ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ মৌসুমে সিলেট অঞ্চলের কৃষকের মাঠে বারির বিজ্ঞানীরা দেখেন, সেখানকার অম্লীয় মাটি ও আবহাওয়ায় প্রচলিত জাতের চেয়ে বারি সূর্যমুখী-২ ভালো ফল দিয়েছে।
বারি সূর্যমুখী-৩ ও হাইব্রিড বীজ
বারি এ পর্যন্ত মাত্র দুটি সূর্যমুখী জাত উদ্ভাবন করেছে, মূল পরিচিতির এই তথ্য ২০২৫ সালের আগেই পুরোনো হয়ে গিয়েছিল। তৃতীয় জাত বারি সূর্যমুখী-৩-কে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ইবাউব জার্নালের গবেষণায় উচ্চফলনশীল জাত (উফশী) বলা হয়েছে। গবেষকেরা চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলে রবি মৌসুমে জাতটি চাষ করেন; এর বীজ আনা হয় কুড়িগ্রাম জেলা থেকে। পাশাপাশি চাষ করা হয় হাইব্রিড ডিএস ২৭৫, যার বীজ আনা হয় নওগাঁ থেকে।
ওই পরীক্ষায় বারি সূর্যমুখী-৩ বোনার ৬১ দিনে ফুল দেয় এবং ১০৩ দিনে পাকে; হাইব্রিডটি ফুল দেয় ৭৮ দিনে, পাকে ১১২ দিনে। বারি সূর্যমুখী-৩ গাছের উচ্চতা ছিল ১০৫.৭২ সেন্টিমিটার, হাইব্রিডের ১৯৮.৭৩ সেন্টিমিটার; তবে এর মাথার ব্যাস (১৮.২৭ সেন্টিমিটার) ও ১,০০০ বীজের ওজন (৬১.৯২ গ্রাম) হাইব্রিডের চেয়ে বেশি ছিল। প্রতি মাথায় পুষ্ট বীজ হাইব্রিডে অনেক বেশি, ১,৭১১টি, বারি সূর্যমুখী-৩-এ ৫৬১টি; ফলনও হাইব্রিডে বেশি, বিঘায় ৮.২০ মণ, বারি সূর্যমুখী-৩-এ ৬.৮৩ মণ।
লবণাক্ত জমিতেও হাইব্রিড বীজের ভূমিকা আছে। দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত ও অলবণাক্ত মাটিতে রোপা আমন ধান কাটার পর চালানো এক পরীক্ষা ২০১৮ সালে বাংলাদেশ অ্যাগ্রোনমি জার্নালে প্রকাশিত হয়। এতে হাইব্রিড হাইসান-৩৩, কেইউ-এসএল-১ নামের একটি জিনোটাইপ ও বারি সূর্যমুখী-২ তুলনা করে সিদ্ধান্ত টানা হয়, লবণাক্ত মাটির জন্য হাইসান-৩৩ এবং অলবণাক্ত মাটির জন্য কেইউ-এসএল-১ সবচেয়ে ভালো বিবেচিত হতে পারে। বারি, ইরির বাংলাদেশ কার্যালয় ও বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত উপকূলীয় গবেষণায় বারি সূর্যমুখী-২ এসভিএস ০০৯০১ জাতের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি বীজ দেয়।

জমি, মাটি ও মৌসুম
মূল পরিচিতি বলছে, সূর্যমুখী সাধারণত সব মাটিতেই জন্মে, তবে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। ইউএসডিএ নির্দেশিকা যোগ করে, গাছটির পূর্ণ রোদ দরকার। বাংলাদেশে দুই মৌসুমেই এর চাষ হয়: বারি সূর্যমুখী-২-এর জন্য বারি রবি ও খরিপের আলাদা জীবনকাল ও ফলন দিয়েছে, এবং রবি মৌসুমে ফলন বেশি।
বোনার তারিখ গুরুত্বপূর্ণ। ২০১২-১৩ সালে জয়দেবপুর ও হাটহাজারীতে বারির পরীক্ষায় ১০ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচটি তারিখ যাচাই করা হয়। ২০ নভেম্বর বুনলে ফলন সবচেয়ে বেশি হয়, হেক্টরে ২.৫ টন, আর গবেষকেরা এটিকেই সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে সিদ্ধান্ত দেন; ২০ ডিসেম্বর বোনায় ফলন সবচেয়ে কম, ১.৮৩ টন। সিলেটে ইউএনবি ২০১৯ সালের মার্চে জানায়, কৃষকেরা চাষ শুরুর আগে বারি তিন বছর পরীক্ষা চালিয়েছে, এবং সেখানে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে বীজ বুনতে হয়।
শুকনো মৌসুমে যেখানে অন্য ফসল কম হয়, সেখানেও সূর্যমুখী মানিয়ে নেয়। মংগাবে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জানায়, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৫৩ শতাংশ সরাসরি লবণাক্ততায় আক্রান্ত, এবং ঘূর্ণিঝড় সিডর (২০০৭) ও আইলার (২০০৯) জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের মাটিতে লবণ বেড়েছে। ইবাউব গবেষণাপত্র বলছে, উপকূলের কৃষকেরা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপায় হিসেবে সূর্যমুখী চাষ করছেন, প্রায়ই রোপা আমন ধানের পর। ২০২৩ সালের নভেম্বরের উপকূলীয় গবেষণায় দেখা যায়, সেরা ব্যবস্থাপনায় ফসলের মৌসুমে মাটির লবণাক্ততা অনেক কমে, আর মাঝারি ব্যবস্থাপনার চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার চেয়ে ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশ বেশি বীজ পাওয়া যায়।
বপন ও পরিচর্যা
মূল পরিচিতিতে বারির সুপারিশকৃত বীজের হার হেক্টরে ৮ থেকে ১০ কেজি। এর বাইরে সূত্রগুলোতে এই পদ্ধতিগুলোর কথা আছে:
- সারিতে বুনুন। ইবাউব গবেষণায় সারি করে বীজ বোনা হয় এবং সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনায় খেত আগাছামুক্ত রাখা হয়; প্রয়োজনমতো সেচ, মালচিং ও বালাই ব্যবস্থাপনাও করা হয়।
- সরকারি নির্দেশিকা মেনে সার দিন। ইবাউব গবেষকেরা নিজেদের কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সার সুপারিশ নির্দেশিকা (২০১২) অনুযায়ী সার দেন; তাঁদের খরচের তালিকায় আছে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি, জিপসাম, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ও বোরাক্স। সঠিক মাত্রা মাটির ওপর নির্ভর করে, তাই উপজেলা কৃষি অফিসে জেনে নিন।
- হিসাব করে সেচ দিন। ২০১৯ সালে সিলেটের চাষিরা ইউএনবিকে জানান, ফসলটিতে দুটি সেচ ও একবার সার লাগে; ইউএসডিএ নির্দেশিকা বলছে, চারা প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত পানি দিতে হয়।
- মাথা রক্ষা করুন। ইউএসডিএ নির্দেশিকা সতর্ক করে, পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী বীজ ও কচি চারা দুটোই খায়, তাই জাল বা কাকতাড়ুয়া লাগতে পারে।
- সময়মতো ফসল তুলুন। ইবাউব পরীক্ষায় পূর্ণ পরিপক্বতায়, মাথার ৮০ শতাংশ হলদেটে হয়ে গেলে, ফসল তোলা হয়।
বারি কিরণী জাতকে পাতার রোগ অল্টারনারিয়া ব্লাইট মোটামুটি সহনশীল বলে বর্ণনা করেছে। খেতে যেকোনো রোগ বা পোকা দেখা দিলে, এবং যেকোনো সার বা বালাইনাশকের মাত্রার জন্য, স্প্রে করার আগে ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে সমস্যাটি দেখানোই নিরাপদ।

খরচ ও আয়
বাংলাদেশে সূর্যমুখী চাষের খরচের যে অল্প কয়টি প্রকাশিত হিসাব আছে, ইবাউব গবেষণা তার একটি। বরেন্দ্র অঞ্চলে হেক্টরপ্রতি মোট চাষ খরচ দাঁড়ায় ৮০,৮৫১ টাকা, যার মধ্যে পরিবর্তনশীল খরচ ৫৮,৪৪১ টাকা। সবচেয়ে বড় খরচ জমি ব্যবহার, ২৭.৭২ শতাংশ; এরপর শ্রম (১৪.৭৮ শতাংশ), সার (১৩.৩৯ শতাংশ) ও বীজ (১৩.৩২ শতাংশ)। উফশী বীজের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা, হাইব্রিড বীজের ৮৮০ টাকা।
কেজিপ্রতি ১০০ টাকা দরে বারি সূর্যমুখী-৩ বিঘায় ২৭৩.৩৩ কেজি ফলন দেয় এবং নিট আয় হয় ১৬,৫১১ টাকা, আয়-ব্যয়ের অনুপাত ২.৫২; হাইব্রিড ডিএস ২৭৫ বিঘায় ৩২৮ কেজি ফলন দেয়, নিট আয় ২১,৯৭৮ টাকা, অনুপাত ৩.০৩। গবেষকদের সিদ্ধান্ত, দুটিই খামার পর্যায়ে লাভজনক।
মাঠের প্রতিবেদনেও কাছাকাছি চিত্র মেলে। ২০১৯ সালে সিলেটে ইউএনবি জানায়, প্রতি মণ সূর্যমুখী বীজ বিক্রি হয় ২,৪০০ থেকে ৩,০০০ টাকায়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুলনায় ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক মোহন কুমার ঘোষ বাসসকে বলেন, এক বিঘা জমিতে প্রায় ৮ মণ সূর্যমুখী বীজ উৎপাদিত হয়, এবং বীজ বিক্রির বাজার তৈরির উদ্যোগ চলছে। মংগাবে জানায়, পটুয়াখালীর এক কৃষক তিন একর জমি থেকে প্রায় ৭৫ মণ বীজ পেয়ে প্রায় ১,৭০,০০০ টাকা আয় করেন।
যেসব এলাকায় সূর্যমুখী ছড়াচ্ছে
২০২৩-২৪ মৌসুমের মধ্যে ফসলটি বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখিত মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলো ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। বাসস ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানায়, খুলনা অঞ্চলে ৩,২৬৫ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৩,১০০ হেক্টরে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৭,৪৫১ টন:
- খুলনা: ১,৮০৯ হেক্টর, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪,৮২২ টন।
- বাগেরহাট: ১,০৪৮ হেক্টর, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২,০৫১ টন।
- সাতক্ষীরা: ১৩৮ হেক্টর, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৩৩৮ টন।
- নড়াইল: ১০৫ হেক্টর, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৪০ টন।
বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় ধান কাটার পর ১৫০ হেক্টর পতিত জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়, যার ১৩৭ হেক্টর সরকারি প্রণোদনার আওতায়; ১,০৩০ জন কৃষককে বীজ, সার ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৩ সালের এপ্রিলে জানায়। মোহন কুমার ঘোষ ২০২৪ সালে বলেন, লাভজনক ও কম খরচের হওয়ায় সূর্যমুখী চাষ অনেক জনপ্রিয় হয়েছে।
মংগাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ২০২৩-২৪ মৌসুমে ২,১৭০ একর জমিতে ২,০০০-এর বেশি কৃষকের সূর্যমুখী চাষে সহায়তা দেয় এবং প্রায় ১,৬৮০ টন বীজ পাওয়ার আশা করে; সংস্থাটির জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির প্রকল্প ব্যবস্থাপক বশির আহমেদ বলেন, এই ফসল অনুর্বর জমিকে "ফুলের সোনালি সাগরে" বদলে দিয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বারির ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মাহমুদুল ইসলাম নজরুল ২০১৯ সালে ইউএনবিকে বলেন, সিলেটে বাণিজ্যিক সূর্যমুখী চাষের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁরা আশাবাদী।
পরামর্শ কোথায় পাবেন
- উপজেলা কৃষি অফিস (ডিএই): উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাত, বোনার সময়, সারের মাত্রা, পোকামাকড় ও রোগ এবং তেলফসলে সরকারি বীজ ও সার সহায়তা নিয়ে পরামর্শ দেন।
- বারির তেলবীজ গবেষণা কেন্দ্র, জয়দেবপুর, গাজীপুর: বারির তেলফসল গবেষণার কেন্দ্র; এর বিজ্ঞানীরা ২০২৩ সালের উপকূলীয় গবেষণার মতো সূর্যমুখী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।
- সার সুপারিশ নির্দেশিকা (বিএআরসি): কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলভিত্তিক ফসলওয়ারি সারের মাত্রার সরকারি নির্দেশিকা; নির্দিষ্ট জমির জন্য সঠিক মাত্রা কৃষি অফিস বুঝিয়ে দিতে পারে।
ছবি: ইয়াহিয়া / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাপিডিয়া, ইউএসডিএ প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সেবা, বাংলাদেশ অ্যাগ্রোনমি জার্নাল, ইবাউব জার্নাল, আক্তা উনিভেরসিতাতিস আগ্রিকুলতুরে এত সিলভিকুলতুরে মেন্দেলিয়ানাএ ব্রুনেনসিস, বাসস, মংগাবে, ইউএনবি, ঢাকা ট্রিবিউন




মন্তব্য
(০)