ঢাকার মিরপুরের রূপনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে সংরক্ষণ ও বিক্রির জন্য রাখা ১ হাজার ১০৪টি বিদেশি প্রাণী উদ্ধার করেছে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট (ডব্লিউসিসিইউ)। ২০২৬ সালের ২ জুলাই, বৃহস্পতিবার, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রূপনগরের ‘টি’ ব্লকের ৬ নম্বর সেকশনের একটি বাসায় এ অভিযান চালানো হয়। পরিবেশবিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যালায়েন্সের (বিডব্লিউএ) সদস্যরা অভিযানে সহায়তা করেন। প্রাণীগুলো আবাসিক ভবনের ছাদে তৈরি অ্যাকুরিয়ামে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল।
কী কী প্রাণী উদ্ধার হয়েছিল
৩ জুলাই ডব্লিউসিসিইউর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া প্রাণীর বেশির ভাগই ছিল কচ্ছপ। তালিকাটি এমন:
- ৮৪৬টি রেড-ইয়ার স্লাইডার কচ্ছপ
- ১৩৮টি রিভস কচ্ছপ
- ৫৬টি কমন স্ন্যাপিং কচ্ছপ
- ৩৮টি ইয়েলো-ইয়ার স্লাইডার কচ্ছপ
- ১৮টি পিংক-বেলিড সাইডনেক কচ্ছপ
- দুটি কর্ন সাপ ও একটি মেক্সিকান ব্ল্যাক কিংস্নেক
- একটি গোল্ডেন চাকুনি ট্যারান্টুলা ও একটি ব্লাড লেগ ট্যারান্টুলা
- একটি ডাম্পি ব্যাঙ, একটি লেপার্ড গেকো ও একটি রাউন্ড-টেইল লেপার্ড গেকো
উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোর মধ্যে ২১টি মৃত ছিল। এ ঘটনায় ৩৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬-এর ৩৩ ধারায় রূপনগর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ডব্লিউসিসিইউ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই বাণিজ্যে আরও কয়েকজনের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাঁদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। বিবিসি বাংলা জানায়, সেখানে প্রায় ছয় হাজার প্রাণী ছিল বলে জানা গেছে; প্রায় পাঁচ হাজার প্রাণী অভিযানের আগেই বিক্রি হয়ে যায়।

প্রাণীগুলো কোথাকার
এসব প্রাণীর কোনোটিই বাংলাদেশের নয়। রেড-ইয়ার স্লাইডার কচ্ছপের আদি নিবাস যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল এবং উত্তর মেক্সিকো; এটি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হওয়া সরীসৃপ এবং বিশ্বের ১০০টি সবচেয়ে আগ্রাসী প্রজাতির তালিকায় আছে। প্রকৃতিতে ছাড়া পেলে কম বয়সে প্রজননক্ষম হওয়া, বেশি ডিম পাড়া ও বড় আকারের কারণে এটি স্থানীয় কচ্ছপের সঙ্গে খাবার ও জায়গার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। কর্ন সাপ যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের নির্বিষ সাপ, মেক্সিকান ব্ল্যাক কিংস্নেকের বাস মেক্সিকোর সোনোরান মরুভূমি অঞ্চলে, আর লেপার্ড গেকো আফগানিস্তান, ইরান, পাকিস্তান, ভারত ও নেপালের শুষ্ক তৃণভূমি ও মরু অঞ্চলের প্রাণী। চাকো গোল্ডেন নি বড় আকারের ট্যারান্টুলা, ২০ থেকে ২২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিষাক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এবং জীববৈচিত্র্যে প্রভাব পড়ার শঙ্কা থাকায় আইন অনুযায়ী এ ধরনের প্রাণী বাংলাদেশে আনার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।


শখ, পাচারের পথ ও নজরদারি
বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদ বিবিসি বাংলাকে দুটি কারণের কথা বলেন: দেশে বিদেশি প্রাণী পোষার প্রবণতা বেড়েছে, আবার বাংলাদেশকে পাশের দেশে পাচারের পথ হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, "যারা শৌখিন পালক তাদের জন্য আনা হয় এবং আরেকটা হচ্ছে আমাদের দেশ একটা রুট হিসেবে ব্যবহার হয়। থাইল্যান্ড বা বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে আসে, চোরাইপথে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে চলে যায়।" তিনি মনে করেন, অনুমতি নিয়ে আনা যায় এমন প্রাণীর আড়ালেই অবৈধ প্রাণী আসছে, আর বিমানবন্দরে স্বর্ণ বা অন্য পণ্যে বাড়তি নজরদারি থাকলেও পোষা প্রাণীর ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। বিমানবন্দরে ডব্লিউসিসিইউর একটি অফিস করার প্রস্তাবও দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া রোগবালাইয়ের ঝুঁকির কথা বলেন: "বিদেশি একটি প্রাণির উপস্থিতিতে আমাদের পরিবেশে কী প্রভাব পড়বে, কী রোগবালাই আছে সেগুলো ছড়াবে কিনা- যেহেতু এগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে না তাতে ক্ষতির সুযোগ থাকে।" এ ব্যবসায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের কথাও বলেন তিনি।
বন বিভাগ অবশ্য দাবি করে, বিমানবন্দর ও দেশের বাজারে নজরদারি রয়েছে। ডব্লিউসিসিইউর বন্যপ্রাণী পরিদর্শক আব্দুল্লাহ-আস-সাদিক বলেন, "অ্যাকুরিয়াম ফিশ বা অ্যাকুরিয়াম স্পেসিজ হিসেবে এগুলোর ভিতরে করে অনেকেই বিদেশ থেকে অবৈধ প্রাণী আনেন, অর্কিডের ভিতরে করেও আনেন। বিমানবন্দর থেকে অবৈধ অনেক প্রাণী সিজ করা হয়।" তিনি জানান, বন্যপ্রাণী অবৈধভাবে আমদানি, রপ্তানি, কেনাবেচা, সংরক্ষণ ও পরিবহন দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এ ধরনের অপরাধে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। কয়েক দিন আগে মিরপুরেই আরেক অভিযানে আট প্রজাতির ৪২টি দেশীয় বন্যপ্রাণী উদ্ধারের কথাও জানান তিনি।

ছবি: Eugene Zelenko / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, বাংলাদেশ প্রতিদিন, চ্যানেল আই অনলাইন, ভোরের কাগজ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)