২০২৬ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে বাগেরহাটে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) এর মাজারসংলগ্ন বড় দিঘিটি কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে। বুধবার, ৩ জুন বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসন দিঘির একমাত্র কুমিরটিকে, যেটি ছিল স্ত্রী কুমির, ধরে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। এর আগে সোমবার, ১ জুন রাতে কুমিরটি আট বছরের এক শিশুকে দিঘিতে টেনে নিলে শিশুটির মৃত্যু হয়; সেই ঘটনার পরই কুমিরটি সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জাগো নিউজ ২৪ ৪ জুন জানায়, মাজারের খাদেম, ঘাটের পাশের দোকানি ও স্থানীয় বাসিন্দারা এতে ক্ষুব্ধ; তাঁদের ভাষায় এটি খানজাহান আলী (রহ.) এর সময় থেকে চলে আসা ঐতিহ্য। খাদেম ও স্থানীয়রা পত্রিকাটিকে বলেন, ৬০০ বছর ধরে দিঘিতে কুমির ছিল, আর এই প্রথম দিঘিটি কুমিরশূন্য হলো। প্রয়োজনে ঘাটে বেড়া বা গ্রিল দিয়ে কুমিরটি ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তাঁরা, এবং দরকার হলে কুমির ফেরাতে আন্দোলনে নামার কথাও বলেন।
হামলা থেকে কুমির সরানো পর্যন্ত
দ্য ডেইলি স্টার বাংলার খবর অনুযায়ী, সোমবার রাত আনুমানিক ৮টা ২০ থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে দিঘির মহিলা ঘাটে মায়ের সঙ্গে গোসল করতে নামলে শিশুটিকে কুমির আক্রমণ করে। প্রথম আলো সে রাতের প্রথম প্রতিবেদনে সময় রাত সোয়া ৮টা এবং শিশুটির বয়স সাত বছর লিখেছিল; দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪, দেশ রূপান্তর ও দ্য ডেইলি অবজারভার তার বয়স আট বছর জানায়। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন ডেইলি স্টারকে বলেন, কুমিরটি শিশুটিকে আক্রমণ করে গভীর পানিতে টেনে নিয়ে যায়। ঈদের ছুটির কারণে মাজারে তখন অনেক দর্শনার্থী ছিলেন; স্থানীয় তরুণেরা নৌকা নিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ততক্ষণে কুমিরটি শিশুটিকে গভীর পানিতে নিয়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বন বিভাগ, পুলিশ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা চারটি নৌকা নিয়ে সারা রাত দিঘিতে খোঁজ চালান। পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার বলেন, অন্ধকারের কারণে উদ্ধার কাজ কঠিন হয়ে পড়েছিল। ডেইলি স্টারের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার, ২ জুন ভোর পৌনে ৫টার দিকে ডুবুরিরা শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করেন; দেশ রূপান্তর লিখেছে, মরদেহটি দিঘির পূর্ব প্রান্তে ভেসে ওঠে। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, পাহারাদার থাকা সত্ত্বেও এমন দুর্ঘটনা ঘটবে, তা কেউ ভাবেননি।
মঙ্গলবার রাতে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে জরুরি সভা বসে। প্রথম আলো জানায়, জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেনের সভাপতিত্বে ওই সভায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বন বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, মাজারের খাদেম, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন। জনগণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সভায় কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
বুধবার সকালে বন বিভাগ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাজারে জড়ো হন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও বিডিনিউজ২৪ জানায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দিঘির পূর্ব পাড়ে কুমিরটিকে দেখা যায়; দুপুর ১২টার দিকে খাবারের টোপ দিয়ে সেটিকে বেঁধে কড়া নিরাপত্তায় বন বিভাগের গাড়িতে তোলা হয়। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খবরে বলা হয়, দিঘির পূর্ব দিকের একটি ছোট পুকুর থেকে কুমিরটি ধরা হয়, আর শেষবারের মতো দেখতে আসা ভিড় পুলিশ দূরে সরিয়ে রাখে। বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে কুমিরটি সরানো হয়েছে এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি অবজারভার জানায়, স্ত্রী কুমিরটির বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর, ওজন প্রায় ৬০০ কেজি এবং দৈর্ঘ্য ৯ ফুট ৩ ইঞ্চি; সেটি সুস্থ আছে। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড লিখেছে, কুমিরটি সরানোর পর মাজারের প্রধান ঘাটে দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের আবার গোসল করতে দেখা যায়।

‘আমরা মানতেই পারছি না’: খাদেম ও দর্শনার্থীদের কথা
কুমির সরানোর পরদিন জাগো নিউজ মাজারে উপস্থিত মানুষের সঙ্গে কথা বলে। মাজারের ঘাটের পাশের দোকানি বিনা আক্তার বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকেই দিঘিতে কুমির দেখছি। কুমির আমাদের ঘাটেই ডিম পাড়ে। পাড়ে উঠে ছাগল খায়, হাঁস মুরগি খায়, আগে পরে বিভিন্ন সময়ে মানুষকে কামড়িয়েছে। কিন্তু এরকমটা ইতিহাসে কখনো দেখিনি যে কুমিরের আক্রমণে মানুষ মারা গেছে বলে দিঘি থেকে কুমির উঠিয়ে নিয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘৬০০ বছর ধরে আমাদের এই দিঘিতে কুমির রয়েছে। এখন আমাদের এই দিঘিতে কোনো কুমির নেই। এইটা আমরা মানতেই পারছি না। সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে যখন মানুষ মারা যায়, তখন তো বাঘ ধরে খালি করে দেওয়া হয় না। তাহলে কেন এই দিঘির কুমিরটি নিয়ে গেল?’
বরিশাল থেকে আসা দর্শনার্থী আসমা আক্তার বলেন, ‘আমি আগেও এখানে এসে কুমির দেখেছি। আজ এসে শুনি কুমির নিয়ে গেছে। কুমিরটি একটি শিশুকে আক্রমণ করে মেরে ফেলে। বিষয়টা দুঃখজনক। আমি চাই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কুমিরটি ফেরত আনা হোক। কুমিরটি এই মাজার ও দিঘির ঐতিহ্য।’
কুমিরটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠা স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান তপু জানান, তিনি নিজ হাতে কুমিরটিকে বন বিভাগের হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘খুবই কষ্ট লাগছে। আমার জন্য এইটা খুবই হৃদয়বিদারক। ৬০০ বছর ধরেই এই দিঘিতে কুমির ছিল। খানজাহান আলীর ঐতিহ্য এই কুমির। আজ এই দিঘিতে কোনো কুমির নেই। খুবই শূন্য শূন্য লাগছে। সরকারের প্রতি আমার আবেদন থাকবে প্রয়োজনে ফেন্সিং (বেড়া) করে মাজারের দিঘির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার।’
মাজারের খাদেম জামাল হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন মাজারের বিভিন্ন রকম ঐতিহ্য থাকে। আমাদের খানজাহান আলী (রহ.) এর ঐতিহ্য দিঘির এই কুমির। দুর্ঘটনার কারণে আমাদের এই মাজার থেকে কুমিরটি নিয়ে গেছে। দিঘি কুমিরশূন্য হওয়ায় খুবই খারাপ লাগছে। এখন পুনরায় দিঘিতে কুমির ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই। আমরা প্রয়োজনে নিরাপত্তার স্বার্থে ঘাটে গ্রিল দিয়ে আটকিয়ে দেব।’
প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কয়েকদিন আগে একটি শিশুকে কুমির আক্রমণ করে মেরে ফেলে। এ ঘটনাটির জন্য আমরা ব্যথিত। কুমির একটি হিংস্র প্রাণী। দিঘির পানি রক্ষায় খানজাহান আলী (রহ.) দিঘিতে দুটি কুমির ছাড়েন। সেই থেকে এই ৬০০ বছর পর্যন্ত দিঘিতে কুমির ছিল। আমাদের পূর্বপুরুষরা এই কুমিরের দেখভাল করে আসছে। এই ইতিহাস ঐতিহ্য বাগেরহাটবাসীর। এখানে কুমির দেখতে সব ধর্মাবলম্বীরা আসে। ঈদের সময় প্রতিদিন প্রায় ৩-৪ হাজার মানুষ আসে। কিন্তু একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য কুমিরটি যেভাবে নিয়ে গেছে সেটা আমরা মোটেই ভালোভাবে দেখছি না। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আমরা চাই, অনতিবিলম্বে সরকার এবং প্রশাসন কুমিরটি ফিরিয়ে দিক।’
প্রশাসন ও বন বিভাগ যা বলেছে
প্রথম আলো জানায়, জরুরি সভায় মাজার ঘিরে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড, যেমন কুমিরকেন্দ্রিক ব্যবসা ও তাবিজ বিক্রি নিয়েও আলোচনা হয়। সভায় প্রস্তাব আসে কুমিরটিকে নির্দিষ্ট স্থানে বেষ্টনীর ভেতরে রাখা, কুমির যাতে গোসলের ঘাটে আসতে না পারে সে জন্য সুরক্ষা দেয়াল তৈরি করা এবং পুরো মাজার এলাকা প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে আনার। জেলা প্রশাসক বাতেন পত্রিকাটিকে বলেন, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অবকাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত কুমিরটি বন বিভাগের হেফাজতে থাকবে।
দ্য ডেইলি অবজারভারকে জেলা প্রশাসক বলেন, কুমিরটি ছিল দিঘির শেষ কুমির; বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে নিরাপদ বেষ্টনী তৈরি হলে সেটি দিঘিতে ফিরতে পারে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী পত্রিকাটিকে বলেন, কুমিরটি সুস্থ আছে; উপযুক্ত সুরক্ষিত ব্যবস্থা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সেটি উদ্ধার কেন্দ্রে থাকবে, আর বিশেষজ্ঞদের মতামত সাপেক্ষে ভবিষ্যতে ফিরিয়ে আনা হতে পারে। খুলনার উদ্ধার কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, সেখানে চার থেকে সাত দিন নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর কুমিরটির বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
কুমির সরানোর আগে প্রশাসন মাজারের দুটি প্রধান ঘাটে সাময়িকভাবে গোসল নিষিদ্ধ করার কথাও ভাবছিল বলে ২ জুন ডেইলি স্টার জানায়। বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ পত্রিকাটিকে বলেন, ঘাটে কুমিরের প্রবেশ ঠেকাতে দ্রুত বেষ্টনী তৈরি করা হবে; এর আগে আইনশৃঙ্খলা কমিটি ঘাটে লোহার খাঁচার মতো বেষ্টনী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও কাজটি হয়নি। দেশ রূপান্তর ৩ জুন জানায়, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় বেষ্টনীর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
খানজাহান আলী ও তাঁর দিঘি
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, খানজাহান, যিনি খানজাহান আলী নামে বেশি পরিচিত, ছিলেন একজন সুফি সাধক এবং বৃহত্তর যশোর ও খুলনার একাংশ নিয়ে গঠিত অঞ্চলের শাসক। তাঁর উপাধি ছিল উলুগ খান ও খান-ই-আজম। পঞ্চদশ শতকের প্রথমার্ধে, গৌড়ে সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-১৪৫৯) শাসনকালে, তিনি খলিফাতাবাদে, আজকের বাগেরহাটে, প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। সুন্দরবনের প্রান্তের বন পরিষ্কার করে তিনি বসতি গড়েন এবং মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তা ও সেতু নির্মাণ করেন।
বাংলাপিডিয়া লিখেছে, তিনি অনেক দিঘি খনন করেছিলেন; এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাঁর সমাধির কাছের খাঞ্জালি দিঘি, যা খানজাহান আলী দিঘির অপভ্রংশ এবং যার সময় বাংলাপিডিয়ায় ১৪৫০ সাল উল্লেখ আছে, আর ষাটগম্বুজ মসজিদের পশ্চিমের ঘোড়াদিঘি। ১৪৫৯ সালের ২৫ অক্টোবর খানজাহান মারা যান এবং নিজের নির্মিত সমাধিতেই তাঁকে দাফন করা হয়। প্রতিবছর বাংলা চৈত্র মাসে দরগাহ প্রাঙ্গণে বার্ষিক ওরস ও মেলা হয়, আর সারা বছরই অসংখ্য মানুষ তাঁর সমাধিতে আসেন।
সমাধি ও ষাটগম্বুজ মসজিদ ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ১৯৮৫ সালে অন্তর্ভুক্ত ‘মসজিদের শহর বাগেরহাট’ (হিস্টোরিক মস্ক সিটি অব বাগেরহাট) এর দুই কেন্দ্র। ইউনেসকোর বর্ণনায় প্রাচীন খলিফাতাবাদ শহর ৫০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত ছিল; এর স্থাপনাগুলো সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরত্বের দুটি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়: পশ্চিমে ষাটগম্বুজ মসজিদ ঘিরে, আর পূর্বে খানজাহানের সমাধি ঘিরে। ৫০টির বেশি স্থাপনা তালিকাভুক্ত হয়েছে, এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পুরাকীর্তি আইন, ১৯৬৮ অনুযায়ী স্থানটি সংরক্ষণ করে। ইটের স্থাপনাগুলোর জন্য মাটি ও বাতাসের লবণাক্ততাকে হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে ইউনেসকো।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দিঘিটি বাগেরহাট সদর উপজেলায়, যার আয়তন ২৭২.৭৩ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬৬ হাজার ৩৮৯। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার আয়তন ৩ হাজার ৯৫৯.১১ বর্গকিলোমিটার; দক্ষিণে জেলাটি বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত, আর ২০১১ সালে এর জনসংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৭৬ হাজার ৯০।

ছয় শতকের প্রচলিত কথা আর তিন দশকের পরিবর্তন
মাজারের কুমিরের ইতিহাস মূলত স্থানীয় প্রচলিত কথার ওপর দাঁড়িয়ে। মাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্যে, ১৪৫৯ সালে মৃত্যুর আগে খানজাহান আলী (রহ.) নিজেই দিঘিতে কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড় নামে দুটি কুমির ছেড়েছিলেন, আর পরের প্রজন্মগুলোর পুরুষ ও স্ত্রী কুমিরকেও একই নামে ডাকা হতো। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৩ সালের অক্টোবরে জানায়, ভক্তরা কুমিরকে বিশ্বাসের প্রতীক মনে করেন এবং মানত করে হাঁস, মুরগি, ছাগল, এমনকি গরুও দেন।
দিঘির সবচেয়ে বিশদ নথিভুক্ত বিবরণ পাওয়া যায় সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের কর্মকর্তাদের ২০০৩ সালের ৪ মার্চের মাঠ পরিদর্শনে, যা আইইউসিএনের ক্রোকোডাইল স্পেশালিস্ট গ্রুপের নিউজলেটারে প্রকাশিত হয়। দলটি দেখে, দিঘির আয়তন প্রায় ৬০ হেক্টর, সর্বোচ্চ গভীরতা ৬ মিটার, আর চারপাশে পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি খননের সময়ের মাটিতে তৈরি ৩ থেকে ৯ মিটার উঁচু পাড়। খাদেমদের বিবরণ অনুযায়ী তখন দিঘিতে পাঁচটি কুমির ছিল: তিনটি স্ত্রী, একটি পুরুষ এবং প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা একটি বাচ্চা। খাদেমদের হিসাবে স্ত্রী কুমিরগুলোর বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছর আর পুরুষটির ৬০। বর্ষায় কুমিরগুলো আশপাশের খাল ও পুকুরে চলে যেত, শুষ্ক মৌসুমে ফিরত। প্রতিবছর এক থেকে তিনটি বাসা পাওয়া যেত, মাটির প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার নিচে, প্রতিটিতে ৪০ থেকে ৫০টি ডিম; তবে শেষবার বাচ্চা দেখা গিয়েছিল ২০০০ সালে। দিঘিতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল, আর কুমিরকে পবিত্র মনে করা হয় বলে মৃত কুমির দাফন করা হতো।
ঐতিহ্য ধরে রাখতে ২০০৫ সালে ভারত থেকে কুমির আনা হয়। ক্রোকোডাইল স্পেশালিস্ট গ্রুপের ২০১০ সালের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০০৫ সালের জুনে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক ট্রাস্ট থেকে ৪০টি প্রাপ্তবয়স্ক মিঠাপানির কুমির আনা হয়, যার ৮টি পুরুষ ও ৩২টি স্ত্রী। বন বিভাগের সূত্রের বরাতে দ্য ডেইলি অবজারভার জানায়, সে বছর ভারত সরকার একদল মিঠাপানির কুমির উপহার দেয়; এর ছয়টি মাজারের দিঘিতে ছাড়া হয়, অন্যগুলো যায় ঢাকা চিড়িয়াখানা ও ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে। ২০১১ সালের জুলাইয়ে দ্য ডেইলি স্টার দিঘিতে চারটি মিঠাপানির কুমির থাকার কথা জানায়, যার তিনটি ২০০৫ সালের ২৪ জুন মাদ্রাজ থেকে আনা এবং প্রতিবেদনে সেগুলোকে আক্রমণাত্মক বলা হয়।
ডেইলি স্টারের ২০১১ সালের ২৮ জুলাইয়ের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সে বছরের ২৬ জুন গোসল করার সময় দুটি কুমিরের আক্রমণে ৪০ বছর বয়সী এক নারী মারা যান, এবং ১৮ জুলাই আরও দুজন গুরুতর আহত হয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এরপর খাদেমদের একটি পক্ষ ভারত থেকে আনা তিনটি কুমির সরিয়ে নিতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করে, আর আরেকটি পক্ষ এর বিরোধিতা করে আবেদন দেয়; ২০১১ সালের ১৪ জুলাই জেলা প্রশাসন কুমিরগুলো দিঘিতেই রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। একই বছরের অক্টোবরে পত্রিকাটি জানায়, রকেট নামে প্রায় ৩০ বছর বয়সী একটি কুমিরকে দিঘির কাছে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এবং ময়নাতদন্তের পর দিঘির পাড়ে দাফন করা হয়।
ঢাকা ট্রিবিউনের খবর অনুযায়ী, কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের শেষ বংশধরেরা মারা যায় ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। ভারত থেকে আনা ছয়টির চারটি মারা যাওয়ার পর থাকে মাদ্রাজ নামের একটি পুরুষ ও পিলপিল নামের একটি স্ত্রী কুমির; পিলপিল কয়েক বছর ডিম পাড়লেও কোনো ডিম ফোটেনি। প্রায় ৩০ বছর বয়সী মাদ্রাজকে ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর দিঘিতে মৃত পাওয়া যায়, আর স্থানীয় বন্যপ্রাণী কর্মকর্তারা বলেন, ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। এরপর দিঘিতে কেবল একটি স্ত্রী কুমির ছিল। প্রথম আলো উল্লেখ করে, এটি ঐতিহাসিক কুমিরগুলোর বংশধর নয়, আর ২০২৬ সালের এপ্রিলে এই কুমিরের একটি কুকুর টেনে নেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে জনবসতি ও ভিড়ের মধ্যে কুমির রাখা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মাগার: বাংলাদেশের মিঠাপানির কুমির
মাজারের দিঘির কুমিরগুলো মাগার বা জলাভূমির কুমির (Crocodylus palustris), বাংলাদেশে যা মিঠাপানির কুমির নামে পরিচিত। বাংলাপিডিয়া দেশের তিন প্রজাতির কুমিরজাতীয় প্রাণীর কথা বলে: ঘড়িয়াল (Gavialis gangeticus), মোহনার বা লোনাপানির কুমির (Crocodylus porosus) এবং জলাভূমির কুমির। সুন্দরবনের মোহনা ও উপকূলে থাকা লোনাপানির কুমিরকে বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশে মহাবিপন্ন বলেছে, আর জলাভূমির কুমির সম্পর্কে লিখেছে, বন্য পরিবেশে এটি প্রায় বিলুপ্ত; কেবল খানজাহান আলীর মাজারের দিঘিতে কয়েকটি টিকে আছে। দুই প্রজাতি দেখতে প্রায় একই রকম, বন্য পরিবেশে আলাদা করা কঠিন।
ক্রোকোডাইল স্পেশালিস্ট গ্রুপের জন্য আনস্লেম ডি সিলভা ও জানকী লেনিনের লেখা প্রজাতি-বিবরণী (২০১০) অনুযায়ী, মাগার মাঝারি আকারের কুমির; সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ৪ থেকে ৫ মিটার, আর এর গণের জীবিত সদস্যদের মধ্যে এর তুণ্ড সবচেয়ে চওড়া। এটি মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের নদী, হ্রদ ও জলাভূমিতে থাকে; ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ইরানে জলাধার, সেচখাল ও মানুষের খোঁড়া পুকুরেও মানিয়ে নিয়েছে। খুব বেশি গরম ও ঠান্ডা থেকে বাঁচতে মাগার গর্ত খোঁড়ে, আর শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে গর্ত করে ডিম পাড়ে। স্ত্রী কুমির প্রায় ১.৮ থেকে ২ মিটার লম্বা হলে প্রজননক্ষম হয় এবং ২৫ থেকে ৩০টি ডিম পাড়ে, যা ফুটতে ৫৫ থেকে ৭৫ দিন লাগে।
প্রজাতিটি সাইটিসের পরিশিষ্ট ১-এ তালিকাভুক্ত, আর ওই কর্মপরিকল্পনায় উদ্ধৃত ২০০৯ সালের আইইউসিএন লাল তালিকায় এটি ‘সংকটাপন্ন’ (Vulnerable)। ২০১০ সালের কর্মপরিকল্পনায় বিশ্বে বাচ্চা বাদে বন্য মাগারের সংখ্যা ৫ হাজার ৪০০ থেকে ৭ হাজার ১০০ বলে ধরা হয়, আর প্রধান হুমকি হিসেবে আবাসস্থল ধ্বংস ও মাছ ধরার জালে আটকে মৃত্যুর কথা বলা হয়। সেখানে আরও বলা হয়, ভারতের বিভিন্ন অংশে মানুষ ও মাগারের সংঘাতের খবর পাওয়া গেছে, যা কোথাও কোথাও সংখ্যা বৃদ্ধি বা বড় আকারের কুমিরের ইঙ্গিত দেয়।

বন্য পরিবেশে প্রায় হারিয়ে যাওয়া প্রজাতি
সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্প ২০০৩ সালে লিখেছিল, তার কয়েক দশক আগেই সুন্দরবন থেকে মাগার হারিয়ে গেছে, শেষ তিন-চারটি টিকে আছে বাগেরহাটের ওই দিঘিতে। মংগাবের ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০০০ সালে মাগারকে দেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে, যা তাদের ২০১৫ সালের বাংলাদেশের লাল তালিকায় (খণ্ড ৪: সরীসৃপ ও উভচর) উল্লেখ আছে। ক্রোকোডাইল স্পেশালিস্ট গ্রুপের কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়, ভারতের বন্দী প্রজননকেন্দ্রের উদ্বৃত্ত কুমির দিয়ে পুনঃপ্রবর্তনের জন্য বাংলাদেশ একটি সম্ভাব্য দেশ।
তবু মাঝে মাঝে বন্য মাগার ধরা পড়েছে। মংগাবে জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরে কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনটি মাগার ধরা পড়ে: ১৭ অক্টোবর ফরিদপুরের ভুবনেশ্বর নদে একটি পুরুষ, ২১ অক্টোবর পাবনার সুজানগরের একটি জলাভূমিতে ৮০ কেজি ওজনের একটি স্ত্রী এবং ২৮ অক্টোবর নড়াইলের লোহাগড়ার মাইগ্রাম বিলে একটি প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী কুমির। তিনটিকেই খুলনায় বন বিভাগের বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়, অর্থাৎ যে কেন্দ্রে ২০২৬ সালের জুনে মাজারের কুমিরটিকে নেওয়া হলো। খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল তখন মংগাবেকে বলেছিলেন, অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে মাগার ছেড়ে দিলে সেগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা কম; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞানী মনিরুল এইচ খান বলেছিলেন, খোলা জলাশয়ে মাগার নিরাপদ নয়।
বন বিভাগের সবচেয়ে পরিচিত কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি সুন্দরবনের করমজলে। ক্রোকোডাইল স্পেশালিস্ট গ্রুপের নিউজলেটার জানায়, ১১০ থেকে ১২০টি কুমির রাখার মতো একটি লালনকেন্দ্র সেখানে ২০০২ সালের নভেম্বরে তৈরি হয় এবং সে বছরের ডিসেম্বরে কুমিরগুলো সেখানে নেওয়া হয়। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৯ সালের মে মাসে জানায়, কেন্দ্রটি ২০০২ সাল থেকে লোনাপানির কুমিরের প্রজনন করছে। মংগাবে ২০২৩ সালে জানায়, খুলনার কেন্দ্রেও মিঠাপানির কুমির প্রজননের পরিকল্পনা ছিল কর্মকর্তাদের।

বন্যপ্রাণী আইন যা বলে
কুমির সরানোর দিন বাংলাদেশে কুমির সুরক্ষিত ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৮৬ নং আইন) অনুযায়ী, যা ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিলের এবং ৭ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর বলে গণ্য। আইনের তফসিল ১(খ)-তে মাগার বা মিঠাপানির কুমির, লোনাপানির কুমির ও ঘড়িয়াল তালিকাভুক্ত। বাগেরহাটের ঘটনার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কয়েকটি বিধান:
- ধারা ১২: কোনো বন্যপ্রাণী মানুষের জীবনের প্রতি হুমকির কারণ হলে প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমোদন সাপেক্ষে বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন কারণ উল্লেখ করে সেটি অপসারণ, কালিং বা ক্ষেত্রমতো পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন এবং ১৫ দিনের মধ্যে বিষয়টি উপদেষ্টা বোর্ড ও বৈজ্ঞানিক কমিটিতে প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করবেন।
- ধারা ১৪: উদ্ধারকৃত, জব্দকৃত বা ধৃত বন্যপ্রাণীকে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে; তবে রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলে বা শুশ্রূষার প্রয়োজন হলে আবদ্ধ রাখা যাবে।
- ধারা ৩৪: বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য বন অধিদপ্তর উদ্ধার কেন্দ্র স্থাপন করতে পারবে।
- ধারা ১০(৩): সব বন্যপ্রাণী সরকারের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
- ধারা ৪১(৩) ও ৪৪: তফসিল ১(খ)-এর বন্যপ্রাণী শিকার করলে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, আর একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
কুমির সুরক্ষার আইনি ইতিহাসও পুরোনো: ক্রোকোডাইল স্পেশালিস্ট গ্রুপ ২০০৩ সালে উল্লেখ করে, দেশের তিন প্রজাতির কুমিরজাতীয় প্রাণীই ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনে পূর্ণ সুরক্ষিত, আর লোনাপানির কুমির ১৯৭৩ সাল থেকে সুরক্ষিত।
ছবি: TanvirSdq / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দেশ রূপান্তর, দ্য ডেইলি অবজারভার, ঢাকা ট্রিবিউন, মংগাবে, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র, আইইউসিএন ক্রোকোডাইল স্পেশালিস্ট গ্রুপ, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ (বাংলাদেশ আইন)





মন্তব্য
(০)