টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মামুদপুর মধ্যপাড়া গ্রামের গৃহবধূ রিনা বেগম রাসায়নিক বিষ ছাড়া সবজিসহ নানা ফসল আবাদ করে নিজের সংসারের অবস্থা বদলেছেন, তাঁর দেখানো পথে চলেছেন গ্রামের আরও অনেক নারী। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে তাঁর এই সাফল্যের কথা উঠে আসে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ব্যাংককে তাঁকে সম্মাননা দেয়।
দেলদুয়ার ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল জেলার একটি উপজেলা। এর আয়তন ১৮৪ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন আটটি: আটিয়া, দেলদুয়ার, দেওলী, ডুবাইল, এলাসিন, ফাজিলহাটি, লাউহাটি ও পাথরাইল। প্রাচীন আটিয়া মসজিদও এই উপজেলায়।

কৃষক পরিবার থেকে জৈব চাষের মাঠে
দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিনা বেগমের জন্ম ১৯৭১ সালে, দেলদুয়ারেরই হিঙ্গানগর গ্রামে। ১৯৮৫ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্থানীয় কৃষক মাঈনউদ্দিনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ওয়ারিশ সূত্রে স্বামী-স্ত্রী ১৩০ শতাংশ জমি আর ২০ শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি পান। ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, বিয়ের পর শাশুড়ির কাছে তিনি বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ শেখেন। শাশুড়ি বলতেন, বাজারের সারে ফলানো ফসল খেলে রোগব্যাধি হয়; সেই পরামর্শেই তিনি নিজের তৈরি সারে আবাদের দিকে ঝোঁকেন। এ নিয়ে শুরুতে অনেক চাষি বিদ্রূপ করেছিলেন।
২০০৪ সালে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা উবিনীগের (উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা) নয়াকৃষি আন্দোলনের আওতায় তিনি জৈব চাষ ও প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমনের প্রশিক্ষণ নেন। উবিনীগের ব্যাখ্যায় নয়াকৃষি হলো দশটি সহজ নিয়ম মেনে প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর প্রতিবেশসম্মত কৃষি: কীটনাশক বর্জন, রাসায়নিক সারের বদলে খামারেই কম্পোস্ট তৈরি, আর মাটির নিচের পানির বদলে ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহার।
ডেইলি স্টার জানায়, রিনা বেগম গোবর, কলাগাছের উচ্ছিষ্ট, ঝোপঝাড়, লতাপাতা ও গুল্ম দিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করেন, বাড়ির পেছনে করেন ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার। পোকা দমনে ব্যবহার করেন সেক্স ফেরোমন ফাঁদ আর পার্চিং, অর্থাৎ খেতে ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা। স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে তিনি ও উপজেলার আরও ১৯ নারী ভার্মিকম্পোস্ট ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নেন। দেলদুয়ারের তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শোয়েব মাহমুদের তথ্যমতে, রিনা বেগম প্রতি দুই মাসে ছয় মণ ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন করে নিজের ও আশপাশের গ্রামের কৃষকদের কাছে কেজিপ্রতি ২৫ টাকায় বিক্রি করতেন। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনের সময় তাঁর খেতে ছিল বেগুন, চালকুমড়া, ধুন্দল, চিচিঙ্গা, মরিচ, হলুদ, কাঁকরোল, কচু ও লেবু।


ঘরে গড়া বীজের ভান্ডার
চাষের পাশাপাশি রিনা বেগম নানা ফসলের বীজ সংরক্ষণ করেন। উবিনীগ জানায়, স্বামী মাঈনউদ্দিনকে নিয়ে তিনি স্থানীয় জাতের বীজ সংগ্রহ করে প্রথমে নিজের ঘরেই রাখতে শুরু করেন; পরে নয়াকৃষি বীজ নেটওয়ার্কের সদস্য হয়ে নিজের দান করা জমিতে গ্রামে একটি বীজঘর গড়েন। উবিনীগের ২০১৪ সালের এক লেখায় বলা হয়, ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত মামুদপুর নয়াকৃষি বীজঘরে তখন ধানের ১৭টি, ডালের ৫টি, তেলবীজের ৬টি, সবজির ৪০টি ও মসলার ১১টি জাতসহ নানা ফসলের বীজ ছিল। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ৯৭৪ জন কৃষক সেখান থেকে বীজ নেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনের সময় তাঁর সংগ্রহে প্রায় ১০০ জাতের সবজি ও ফসলের বীজ ছিল; ডেইলি স্টারও সবজি, মসলা ও বিলুপ্তপ্রায় ধানের প্রায় ১০০ জাতের বীজের কথা জানায়। রিনা বেগম বলেন, ‘বীজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভালো বীজ হলে ভালো ফসল হয়।’ ডেইলি স্টারকে তিনি জানান, বেশির ভাগ কৃষক নিজের ফসলের বীজ রাখেন না; তিনি তাঁদের কাছে বীজ বিক্রি করেন, কখনো এই শর্তে দেন যে তাঁরা বীজ সংরক্ষণ করে বিনিময়ে তাঁকে ফেরত দেবেন।
নারী কৃষকদের সমিতি আর এফএওর সম্মাননা
ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ২০০৯ সালে ‘মামুদপুর মধ্যপাড়া মহিলা সমবায় সমিতি’ গঠিত হয়, যার সভাপতি রিনা বেগম; সভায় তাঁর পরামর্শে সদস্যরাও আঙিনায় বিষমুক্ত ফসল ফলান। মামুদপুরের নারী কৃষক আমেনা খাতুন ডেইলি স্টারকে বলেন, বীজ বোনা আর সার ব্যবহারের কৌশল তাঁরা রিনা আপার কাছেই শিখেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মনোনয়নে রিনা বেগম ২০১৫ সালে বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে যান। এফএওর এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক কার্যালয়ের সেই অনুষ্ঠানে জৈব চাষে অবদান আর এলাকার নারী কৃষকদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তাঁকে ক্রেস্ট, সনদ ও নগদ অর্থ দেওয়া হয়। উবিনীগ জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয় তাঁকে দেশের সেরা কৃষকদের একজন হিসেবে বেছে নিয়েছিল, আর ১৬ অক্টোবর ব্যাংককে থাইল্যান্ডের রাজকুমারীর হাত থেকে তিনি পুরস্কার নেন। এফএওর আঞ্চলিক কার্যালয় প্রতিবছর এই ‘মডেল ফার্মার’ সম্মাননা দেয়; অঞ্চলের সদস্য দেশগুলো পালা করে এতে অংশ নেয় এবং সরকারই প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে।
ঢাকা ট্রিবিউনকে রিনা বেগম বলেন, বাজারের সার বারবার ব্যবহারে মাটি একসময় শক্ত হয়ে যেতে পারে; তাই নিরাপদ খাদ্যের জন্য কৃষকের ঘরে বীজ রাখা আর জৈব সারে আবাদের চর্চা আশপাশের গ্রাম ছাড়িয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। তবে ডেইলি স্টারকে তিনি এ কথাও বলেন, রাসায়নিক সার পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবে সম্ভব নয়; কম্পোস্ট, বিশেষ করে ভার্মিকম্পোস্ট মাটির উর্বরতা ধরে রাখে।
ছবি: Ayman Nakib Badhan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার, উবিনীগ (উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)