২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জাগো নিউজের কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগে ফিচার লেখক মামুনূর রহমান হৃদয়ের একটি লেখা প্রকাশিত হয়। বিষয় টুনটুনি, জীবন্ত গাছের পাতা সেলাই করে বাসা বানানো ছোট্ট ও চঞ্চল পাখি। লেখায় গ্রামবাংলার রূপকথায় পাখিটির জায়গা, তার বাসা, খাবার ও স্বভাবের বর্ণনা দেওয়া হয় এবং একটি উদ্বেগ জানানো হয়: একসময় গ্রামের সব জায়গায় যে টুনটুনির দেখা মিলত, গাছপালা, ঝোপঝাড়, খাল-বিল ও নদী-নালা ধ্বংস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তার দেখা এখন আর আগের মতো মেলে না।
ফিচারে টুনটুনির বৈজ্ঞানিক নাম লেখা হয়েছিল Orthotomus atrogularis এবং ইংরেজি নাম ডার্ক-নেকড টেইলরবার্ড। এই নামটি আসলে ভিন্ন এবং অনেক বিরল একটি প্রজাতির, যার বাস পাহাড়ি বনে। গ্রামের বাগান আর বাড়ির আশপাশের ঝোপের টুনটুনি হলো পাতি টুনটুনি, ইংরেজিতে কমন টেইলরবার্ড, বৈজ্ঞানিক নাম Orthotomus sutorius। এই প্রতিবেদনে ফিচারের মূল বিষয় ও লেখকের পর্যবেক্ষণ রাখা হয়েছে, নামের ভুলটি সংশোধন করা হয়েছে, এবং বাংলাপিডিয়া, ২০১৫ সালে প্রকাশিত আইইউসিএন বাংলাদেশের পাখির লাল তালিকা, পাখিবিদ্যার প্রচলিত তথ্যসূত্র ও বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ এই পাখি ও তার দুই জ্ঞাতি সম্পর্কে যা বলে, তা যোগ করা হয়েছে।
ফিচারে যা বলা হয়েছিল
ফিচার অনুযায়ী, টুনটুনি ঠোঁট দিয়ে গাছের পাতা ঠোঙার মতো মুড়িয়ে সেলাই করে বাসা বানায়, তাই একে দরজি পাখিও বলা হয়। লেখকের বর্ণনায় পাখিটি প্রায় ১৩ সেন্টিমিটার লম্বা, বুক ও পেট সাদাটে, মাথা ও ডানার উপরিভাগ জলপাই-লালচে, আর লেজ খাড়া, তাতে কালচে দাগ।
লেখকের ভাষ্যে টুনটুনি বেশি বাসা বাঁধে শিম, লাউ, কাঁঠাল, সূর্যমুখী, লেবু, শরিফা (সীতাফল), ডুমুর ও কাঠবাদাম গাছে। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি মিলে বাসা তৈরি করে, এবং সেই নির্মাণশৈলী অন্য পাখির বাসা থেকে একেবারে আলাদা। ফিচারে বলা হয়, টুনটুনি সাধারণত পোকামাকড় খায়, এ ছাড়া কেঁচো, মৌমাছি ও ফুলের মধুও খায়; তার খাদ্যতালিকায় আছে ধান, পাট ও গমের পাতার পোকা, শুঁয়োপোকা ও তার ডিম। লেখকের মতে টুনটুনি সারা বছর বংশবিস্তার করলেও প্রজননের মূল সময় বর্ষাকাল।
লেখক টুনটুনিকে বর্ণনা করেন খুব চতুর ও অস্থির এক পাখি হিসেবে, যে বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়ে মানুষের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে এবং কখনো এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকে না: এই আছে তো এই নেই। লেখার শেষে তিনি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও পাখিটির আবাসস্থল সংরক্ষণের আহ্বান জানান, কারণ তাঁর ভাষ্যে আবাসস্থল নষ্ট হওয়ায় টুনটুনির ডিম পাড়া ও ছানা তোলায় বাধা তৈরি হচ্ছে।
টুনটুনি আর রাজার গল্প
ফিচারের শুরু হয়েছিল এই ছড়া দিয়ে: "রাজার ঘরে যে ধন আছে, টুনির ঘরেও সে ধন আছে"। লাইনটি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর শিশুতোষ গল্পের সংকলন ‘টুনটুনির বই’-এর ‘টুনটুনি আর রাজার কথা’ গল্পের। বাংলা উইকিসংকলনে কলকাতার দেব সাহিত্য-কুটীর প্রকাশিত একটি সংস্করণ থেকে যে পাঠ রাখা আছে, তাতে গল্পের শুরু: রাজার বাগানের কোণে টুনটুনির বাসা ছিল। রাজার সিন্দুকের টাকা রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছিল, সন্ধ্যায় রাজার লোকেরা একটি টাকা ঘরে তুলতে ভুলে যায়। টুনটুনি চকচকে টাকাটি বাসায় এনে রাখে, নিজেকে মস্ত বড়লোক ভাবে আর ছড়াটি বলতে থাকে। বইয়ে মুদ্রাটি কেবল একটি টাকা; ফিচারে তাকে স্বর্ণমুদ্রা বলা হয়েছিল।
গল্প এগোয় এভাবে। রাজা পাখির কথা শুনে টাকাটি ফিরিয়ে আনান, আর টুনটুনি দুঃখে বলে: "রাজা বড় ধনে কাতর, টুনির ধন নিলে বাড়ির ভিতর!" রাজা হেসে টাকা ফেরত দিতে বলেন, তখন টুনি গায়: রাজা ভারী ভয় পেয়ে টুনির টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন। রেগে গিয়ে রাজা পাখিটিকে ভেজে খাওয়ার হুকুম দেন। সাত রানী হাতে হাতে পাখিটি দেখতে গিয়ে সেটি ফসকে উড়ে যায়, আর তাঁরা ধরা পড়ার ভয়ে একটি ব্যাঙ ভেজে রাজাকে খেতে দেন। খাওয়া শেষ হতেই টুনটুনি গায়: "বড় মজা, বড় মজা, রাজা খেলেন ব্যাঙ ভাজা!" এরপর রানীদের নাক কাটা যায়, রাজা পাখিটিকে আস্ত গিলে ফেলেন আর সে ঢেকুরের সঙ্গে বেরিয়ে পালায়। দ্বিতীয়বার সিপাইয়ের তলোয়ার পাখির বদলে পড়ে রাজার নাকে। শেষে টুনটুনি সে দেশ ছেড়ে উড়ে যায়, রাজার লোকেরা এসে দেখে কেবল খালি বাসা পড়ে আছে।
‘টুনটুনির বই’-এর সূচিপত্রের শুরুতেই তিনটি টুনটুনির গল্প: ‘টুনটুনি আর বিড়ালের কথা’, ‘টুনটুনি আর নাপিতের কথা’ এবং ‘টুনটুনি আর রাজার কথা’। এরপর আছে বাঘ, শিয়াল, কুমির আর বোকা মানুষের নানা গল্প, যেমন ‘বাঘ মামা আর শিয়াল ভাগ্নে’ ও ‘পান্তাবুড়ির কথা’। টুনটুনির প্রতিটি গল্পে সবচেয়ে ছোট প্রাণীটি জেতে বুদ্ধির জোরে, আর বাংলাভাষী শিশুদের কয়েক প্রজন্ম পাখিটিকে চিনেছে সেই ছবিতেই।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর জন্ম ১৮৬৩ সালের ১২ মে, তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার, বর্তমানে কিশোরগঞ্জের মসুয়া গ্রামে; মৃত্যু ১৯১৫ সালের ২০ ডিসেম্বর কলকাতায়। শিশুসাহিত্যের পাশাপাশি তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক হাফটোন ও রঙিন ব্লক তৈরির প্রবর্তন করেন, ব্লক তৈরির যে প্রতিষ্ঠান পরে ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স নামে পরিচিত হয় তা গড়ে তোলেন এবং ১৯১৩ সালে শিশুদের পত্রিকা ‘সন্দেশ’ চালু করেন। তিনি লেখক সুকুমার রায়ের বাবা এবং চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের দাদা।
বাংলার বাইরেও পাখিটি সাহিত্যে পরিচিত। রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের ‘দ্য জাঙ্গল বুক’-এর গল্প ‘রিক্কি-টিক্কি-টাভি’-তে এক দরজি পাখি দম্পতি, দারজি ও তার স্ত্রী, প্রধান চরিত্রগুলোর মধ্যে আছে; উর্দু ও হিন্দিতে দারজি মানে দরজি। পাখিবিষয়ক বিবরণে উল্লেখ আছে, গল্পে দারজির স্ত্রী আহত হওয়ার ভান করে, যা বাস্তবের এই প্রজাতির আচরণে জানা নেই।
বাংলাদেশের তিন টুনটুনি
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া টুনটুনিকে বর্ণনা করেছে জলপাই-সবুজ থেকে হলদে-সবুজ রঙের অতি ছোট, পোকাখেকো পাখি হিসেবে, এবং দেশে তিনটি প্রজাতির কথা বলেছে। বাংলাদেশের লাল তালিকায় এদের স্থানীয় নাম: পাতি টুনটুনি, Orthotomus sutorius (Pennant, ১৭৬৯); কালাগলা টুনটুনি, Orthotomus atrogularis (Temminck, ১৮৩৬); এবং পাহাড়ি টুনটুনি, Orthotomus cuculatus (Temminck, ১৮৩৬)।
ফিচারের এবং রূপকথার টুনটুনি হলো পাতি টুনটুনি। বাংলাপিডিয়ার ভাষায় এটি সব বিভাগের গ্রাম, ঝোপঝাড় ও খোলা বনের সুলভ আবাসিক পাখি; থাকে বনের কিনারা, ছোট ঝোপ, ফলবাগান ও বাগানে, নিচু এলাকায় এবং পাহাড়ে প্রায় ১,৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত। লাল তালিকা বলছে, পাখিটি সারা দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। প্রজাতিটির প্রথম বর্ণনা দেন টমাস পেনান্ট, ১৭৬৯ সালে, Motacilla sutoria নামে; দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে এর নয়টি উপপ্রজাতি জানা আছে, যার মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া যায় Orthotomus sutorius patia।
ফিচারে যে কালাগলা টুনটুনির নাম এসেছিল, তার আবাস একেবারে আলাদা। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এর পিঠ জলপাই-সবুজ, মাথার চাঁদি লালচে, ডানার বাঁক তুলনামূলক হলুদ; পুরুষের গলা কালচে ও ঘাড়ে লম্বা দাগ, স্ত্রী পাখি ফিকে ধূসর, চোখ কমলা-বাদামি। এটি থাকে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের চিরসবুজ বনের ঘন ঝোপ ও বাঁশঝাড়ে, এবং বাংলাপিডিয়া একে বিরল আবাসিক পাখি বলেছে। লাল তালিকায় একে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়ি বনের অসুলভ আবাসিক পাখি বলা হয়েছে, যার বৈশ্বিক বিস্তার কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়; এর পাঁচটি উপপ্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে আছে Orthotomus atrogularis nitidus।
তিনটির মধ্যে পাহাড়ি টুনটুনিকে চেনা সবচেয়ে সহজ: পেট উজ্জ্বল হলুদ, গলা ও বুক ধূসর, কপাল লালচে। বাংলাপিডিয়া একে চট্টগ্রাম বিভাগের চিরসবুজ পাহাড়ি বনের বিরল আবাসিক পাখি বলেছে, যে ঝোপের নিচে অতি ক্ষুদ্র পোকা খোঁজে এবং প্রায়ই উড়ে গিয়ে শূন্যে পোকা ধরে। এর ১৩টি উপপ্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে আছে Orthotomus cuculatus coronatus। জিনগত গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃত টুনটুনির চেয়ে এটি Cettia গণের ঝোপ-ফুটকির বেশি কাছের, তাই এখন অনেক পাখির তালিকায় একে Phyllergates cucullatus নামে আলাদা গণে রাখা হয়।
ফিচারে বলা হয়েছিল, পৃথিবীতে ১৫ প্রজাতির টুনটুনি আছে। এই সংখ্যা তালিকাভেদে আলাদা। Orthotomus গণটি প্রতিষ্ঠা করেন প্রকৃতিবিদ টমাস হর্সফিল্ড, ১৮২১ সালে; প্রচলিত তথ্যসূত্রে উদ্ধৃত আইওসি ওয়ার্ল্ড বার্ড লিস্ট অনুযায়ী পাহাড়ি টুনটুনি ও তার নিকটতম প্রজাতিটিকে সরিয়ে নেওয়ার পর এই গণে প্রজাতি ১৩টি। Orthotomus নামের অর্থ সোজা কাটা, আর sutorius মানে দরজি নয়, মুচি। বাংলাদেশের লাল তালিকা টুনটুনিদের রেখেছে পুরোনো বিশ্বের ফুটকি পরিবার Sylviidae-তে, তবে আণবিক গবেষণা পাতি টুনটুনিকে রাখে Cisticolidae পরিবারে, প্রিনিয়া আর সিস্টিকোলাদের সঙ্গে।

পাতি টুনটুনি চেনার উপায়
পাতি টুনটুনি ১০ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার লম্বা, ওজন ৬ থেকে ১০ গ্রাম। শরীরের উপরিভাগ উজ্জ্বল জলপাই-সবুজ, নিচের দিক ঘিয়া সাদা, কপাল ও মাথার চাঁদি লালচে মরিচা রঙের। ডানা খাটো ও গোলাকার, পা শক্ত, ঠোঁট ধারালো এবং ওপরের ঠোঁটের আগা বাঁকানো। সবচেয়ে চেনা বৈশিষ্ট্য তার লম্বা লেজ, যা সে খাড়া করে রাখে এবং প্রায়ই এদিক-ওদিক নাড়ায়।
পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে একই রকম, তবে প্রজনন মৌসুমে পুরুষের লেজের মাঝের পালক লম্বা হয়ে যায়। ছানা ও কম বয়সী পাখির রং অনুজ্জ্বল। পুরুষ ও স্ত্রী দুজনেরই গলার দুই পাশে কালচে, পালকহীন চামড়া থাকে, যা ডাকার সময় দেখা যায় এবং কখনো গলায় কালো একটি পট্টির মতো লাগে।
টুনটুনি লাজুক, সাধারণত পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে, কিন্তু গলার আওয়াজেই ধরা পড়ে। তার গান জোরালো "চিউপ-চিউপ-চিউপ", যা এক অঞ্চলের পাখি থেকে আরেক অঞ্চলের পাখিতে বদলায়; দুই মাত্রার ডাকও সে বারবার দেয়। একা বা জোড়ায় দেখা যায়, সাধারণত ঝোপের নিচের দিকে বা ছোট গাছে, কখনো মাটিতেও লাফিয়ে বেড়ায়। প্রজনন মৌসুমের বাইরে প্রতিটি পাখি একা রাত কাটায়; প্রজনন মৌসুমে জোড়াটি পাশাপাশি বসে ঘুমাতে পারে, কখনো সদ্য বাসা ছাড়া ছানাকে মাঝখানে রেখে। ঘুমানোর জায়গা হয় ওপরে আড়াল থাকা গাছের সরু ডাল, প্রায়ই বাড়িঘর আর আলোর কাছাকাছি।
জীবন্ত পাতায় সেলাই করা বাসা
বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই পাখিটির নাম এসেছে তার বাসা থেকে। একটি বড় পাতা, বা দুটি পাতার কিনারা ফুটো করে উদ্ভিদের আঁশ বা মাকড়সার জাল দিয়ে জুড়ে একটি দোলনার মতো খোল তৈরি হয়, আর তার ভেতরে পাখি বানায় আসল বাসা, নরম উপকরণে মোড়া গভীর একটি বাটি। পাতার ওপরের পিঠ থাকে বাইরের দিকে, আর ফুটোগুলো এত ছোট যে পাতা বাদামি হয়ে যায় না; ফলে বাসা সবুজই থাকে এবং সহজে চোখে পড়ে না।
শ্রীলঙ্কায় টুনটুনির বাসা নিয়ে গবেষণা করা কেসি উড পাখিটির কৌশলকে চার ভাগে ভাগ করেছিলেন: সেলাই, রিভেট বা গিঁটের মতো আটকানো, ফিতার মতো বোনা এবং জট পাকিয়ে জোড়া। দুটি পাতা ফুটো করে তার ভেতর দিয়ে আঁশ টেনে নিয়ে একটি ফোঁড় হয়; বাইরের দিকে আঁশ ফুলে ওঠে, ফলে কাজের দিক থেকে তা রিভেটের মতো আটকে থাকে। কখনো এক ফোঁড়ের আঁশ পাশের ফুটো পর্যন্ত টেনে নেওয়া হয়, তখন সেটি সত্যিকারের সেলাইয়ের মতো দেখায়। প্রকৃতিবিদ টমাস জার্ডন লিখেছিলেন পাখিটি গিঁট দেয়, কিন্তু পরের পর্যবেক্ষকেরা দেখেছেন, কোনো গিঁট ব্যবহার করা হয় না। উডের পরীক্ষা করা একটি বাসার ভেতরে ছিল মনসা জাতীয় (ইউফোরবিয়া) গাছ, কাপোক এবং শিমুলের (Bombax malabaricum) তুলা।
সব বাসা একই রকম হয় না। কোনোটি একটিমাত্র বড় পাতার দুই কিনারা জুড়ে তৈরি, কোনোটিতে পাতার খোলই থাকে না। এই কৌশল কেবল টুনটুনির নিজস্বও নয়: তার নিকটাত্মীয় অনেক প্রিনিয়া একইভাবে বাসা বানায়।
বাংলাপিডিয়া দিয়েছে বাংলাদেশের চিত্র। পাতি টুনটুনি চওড়া পাতার ঝোপ ও গাছে ঝুলে থাকা এক বা দুটি পাতার কিনারা সেলাই করে মোচাকৃতির বাসা বানায়। কালাগলা টুনটুনি বাসা বাঁধে মাটির খুব কাছে, ঘাস বা সরু শিকড় দিয়ে পাতা সেলাই করে, ভেতরে নরম পালক বিছিয়ে; পাহাড়ি টুনটুনি বাসা বানায় মাটি থেকে এক মিটারের বেশি উঁচুতে ঝোপের ভেতর। ফিচারে যে গাছগুলোর নাম এসেছে, শিম-লাউয়ের লতা থেকে কাঁঠাল, লেবু বা ডুমুর, সবই বাড়ির আশপাশের চওড়া পাতার গাছ, যা এই বর্ণনার সঙ্গে মেলে।

খাবার, প্রজনন মৌসুম ও শত্রু
বেশির ভাগ ফুটকি পাখির মতো পাতি টুনটুনিও পোকাখেকো। প্রচলিত তথ্যসূত্রে নানা ধরনের গুবরেপোকা ও শোষক পোকা খাওয়ার কথা আছে। ফুলে বসা পোকার দিকে সে আকৃষ্ট হয়, বিশেষ করে আমের মুকুলে। মধুর জন্য শিমুল ফুলেও যায়, আর কখনো পরাগরেণুতে মাথা মেখে ফেরে, তখন মাথাটা সোনালি দেখায়। বাংলাপিডিয়া ও বাংলাদেশের লাল তালিকা বলছে, পাখিটি দিনের বেলা সক্রিয়, জোড়ায় বা পারিবারিক দলে গ্রাম, বনের কিনারা, ঝোপ, ফলবাগান ও বাগানে খাবার খোঁজে, খায় অতি ছোট পোকা ও তাদের লার্ভা, আর পাতার আড়াল থেকে পোকা ধরতে এক ডাল থেকে আরেক ডালে যায়।
ধান, পাট ও গমের পাতার পোকা থেকে শুঁয়োপোকা ও তার ডিম পর্যন্ত যে খাদ্যতালিকা ফিচারে দেওয়া হয়েছে, তা লেখকের বর্ণনা; এই প্রতিবেদনের জন্য দেখা তথ্যসূত্রগুলোতে খাবারের বর্ণনা সাধারণভাবে ছোট পোকা, লার্ভা, গুবরেপোকা ও শোষক পোকা এবং ফুলের মধু।
ফিচারে বলা হয়েছিল, টুনটুনি সারা বছর বংশবিস্তার করলেও মূলত বর্ষাকালে, এবং তথ্যসূত্রগুলোও তা সমর্থন করে। ভারতে প্রজনন মৌসুম মার্চ থেকে ডিসেম্বর, সবচেয়ে বেশি জুন থেকে আগস্টে, বর্ষার সঙ্গে মিলিয়ে। শ্রীলঙ্কায় প্রধান প্রজননকাল মার্চ থেকে মে এবং আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর, যদিও পাখিটি সারা বছরই ডিম পাড়তে পারে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে পাতি টুনটুনির প্রজনন মৌসুম মে থেকে জুলাই।
সাধারণত তিনটি ডিম হয়। তা দিতে লাগে প্রায় ১২ দিন, আর ছানারা বাসা ছাড়ে প্রায় ১৪ দিনে। কোনো সূত্রে বলা হয় কেবল স্ত্রী পাখি ডিমে তা দেয়, কোনো সূত্রে দুজনেই; তবে ছানাদের খাওয়ানো ও বাসা পরিষ্কার রাখার কাজ মা-বাবা দুজনেই করে, এবং বলা হয় পুরুষ পাখি ডিমে বসে থাকা স্ত্রীকে খাবার এনে দেয়। ক্ষতির হার বেশি: ইঁদুরজাতীয় প্রাণী, বিড়াল, টিকটিকি-গিরগিটি এবং বাংলাদেশে বড় কুবো নামে পরিচিত পাখি (গ্রেটার কুকাল) অনেক ডিম ও ছানা খেয়ে ফেলে। করুণ পাপিয়া কখনো টুনটুনির বাসায় ডিম পেড়ে যায়, আর তার ছানা বড় করে টুনটুনিরাই।
গ্রামের বসতভিটার পাখি
বাংলাদেশের লাল তালিকা বসতভিটাকে পাখির একটি আলাদা আবাসস্থল হিসেবে দেখেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ঐতিহ্যগতভাবে গ্রামের প্রতিটি পরিবারের ছিল ফলের বাগান, বাঁশঝাড়, সবজিবাগান আর একটি ছোট পুকুর; গ্রামে ছিল ঘাসজমি আর জঙ্গলের টুকরো, যেখান থেকে মানুষ রান্নার জন্য শুকনো ডাল ও ঝরা পাতা কুড়াত। এমন গ্রাম ছিল বহু পাখির ভালো আবাস, এবং বইটি বসতভিটার গাছপালাকে দেশের পাখির নবম আবাসস্থল হিসেবে গণ্য করেছে, বন, তৃণভূমি, নদী, হাওর, মোহনা ও বঙ্গোপসাগরের পর।
গ্রামে সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া গায়ক পাখিদের তালিকায় বইটি টুনটুনির নাম রেখেছে ফটিকজল, কসাই পাখি, হলদে পাখি, ফিঙে, বুলবুলি, ছাতারে, শালিক-ময়না জাতীয় পাখি, মৌটুসি, চড়ুই ও বাবুইয়ের সঙ্গে। একই সঙ্গে বইটিতে সেই পরিবর্তনের কথাও আছে, যা নিয়ে ফিচারের লেখক উদ্বিগ্ন ছিলেন: জনসংখ্যা ও ভোগবাদ বাড়ার সঙ্গে অনেক গ্রাম ছোট মফস্বল শহর বা ঘিঞ্জি বসতিতে পরিণত হচ্ছে, যদিও কিছু গ্রাম এখনো তার চিরচেনা রূপ ধরে রেখেছে এবং পাখির জন্য বাসযোগ্য রয়ে গেছে।
শহরের বাগানেও পাতি টুনটুনি পরিচিত পাখি: প্রচলিত তথ্যসূত্রে একে শহুরে বাগানের সুলভ আবাসিক পাখি বলা হয়েছে, খোলা কৃষিজমি, ঝোপঝাড় ও বনের কিনারার পাশাপাশি।

লাল তালিকায় টুনটুনির অবস্থান
২০১৫ সালে প্রকাশিত আইইউসিএন বাংলাদেশের ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, ভলিউম ৩: বার্ডস’ ৫৬৬ প্রজাতির পাখি মূল্যায়ন করে। এর মধ্যে ১০টি মহাবিপন্ন, ১২টি বিপন্ন ও ১৭টি সংকটাপন্ন, সব মিলিয়ে ৩৯টি প্রজাতি হুমকির মুখে, যা মূল্যায়িত পাখির প্রায় ৭ শতাংশ। আরও ২৯টি প্রজাতি প্রায়-সংকটাপন্ন এবং ৫৫টির ক্ষেত্রে তথ্য অপর্যাপ্ত।
পাতি টুনটুনির মূল্যায়ন হয় ২০১৫ সালের ১০ মে, ফল ন্যূনতম উদ্বেগ (লিস্ট কনসার্ন)। যুক্তিতে বলা হয়েছে, এই সুলভ আবাসিক পাখি সারা বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে, এটি নমনীয় এবং নানা ধরনের আবাসে টিকে থাকতে পারে। মূল্যায়নে এর বিস্তারের পরিধি (এক্সটেন্ট অব অকারেন্স) ধরা হয়েছে ২,২২,৫০৮ বর্গকিলোমিটার এবং বসবাসের এলাকা (এরিয়া অব অকুপেন্সি) ১,৩৯,৭৭১ বর্গকিলোমিটার; মোট সংখ্যা ও সংখ্যার প্রবণতা লেখা হয়েছে অজানা, এবং বলা হয়েছে ২০০০ সালের জাতীয় মূল্যায়নে পাখিটি ছিল ‘হুমকিগ্রস্ত নয়’।
বিরল দুই টুনটুনিকেও ২০১৫ সালে ন্যূনতম উদ্বেগের তালিকায় রাখা হয়, যদিও ২০০০ সালে দুটিই ছিল তথ্য-অপর্যাপ্ত তালিকায়। লাল তালিকা বলছে, কালাগলা টুনটুনি ক্ষয়িষ্ণু বনেও বাড়তে পারে এবং তার কিছু আবাস সংরক্ষিত; পাহাড়ি টুনটুনিও ক্ষয়িষ্ণু বনে টিকে থাকতে পারে এবং তার কয়েকটি আবাস সংরক্ষিত। বৈশ্বিক পর্যায়ে আইইউসিএন লাল তালিকায় পাতি টুনটুনি ন্যূনতম উদ্বেগের প্রজাতি, বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের ২০১৬ সালের মূল্যায়নে।
অর্থাৎ জাতীয় মূল্যায়নে টুনটুনিকে হুমকিগ্রস্ত ধরা হয়নি, আবার তার সংখ্যা বা সংখ্যার প্রবণতারও কোনো হিসাব ছিল না। পাখিটি আগের মতো চোখে পড়ে না, এই ধারণা ফিচারের লেখকের গ্রামীণ পর্যবেক্ষণ; আর গ্রামের যে রূপান্তর পাখিটির নির্ভরতার ঝোপঝাড় ও বাগান কমিয়ে দেয়, লাল তালিকা নিজেই তা লিপিবদ্ধ করেছে।
২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইনে সুরক্ষা
ফিচারটি প্রকাশের সময় বাংলাদেশে বন্য পাখি সুরক্ষিত ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর অধীনে, যা ২০১২ সনের ৩০ নং আইন, তারিখ ১০ জুলাই ২০১২। আইনের ৬(১) ধারা অনুযায়ী এই আইনের অধীন লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কোনো ব্যক্তি কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারেন না, আর ৬(২) ধারা সরকারকে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বা সব বন্যপ্রাণী কোনো নির্দিষ্ট বন, এলাকা বা সারা দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিকার নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়।
আইনের প্রথম দুটি তফসিলেরই শিরোনাম ‘রক্ষিত বন্যপ্রাণী’। পাতি টুনটুনি আছে তফসিল ২-এ, আর কালাগলা ও পাহাড়ি টুনটুনি তফসিল ১-এ।
৩৮(১) ধারা অনুযায়ী তফসিল ১ ও ২-এ উল্লিখিত কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা করলে অপরাধী সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন; একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ৩৮(২) ধারা অনুযায়ী এমন পাখির ট্রফি বা অসম্পূর্ণ ট্রফি, মাংস বা দেহের অংশ সংগ্রহ, দখলে রাখা, কেনা-বেচা বা পরিবহন করলে সর্বোচ্চ ৬ মাস কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, এবং পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
ছবি: Faisal Akram / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩), বাংলাপিডিয়া (টুনটুনি), আইইউসিএন বাংলাদেশ, রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ ভলিউম ৩: বার্ডস (২০১৫), বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ ও তার তফসিল (বিডিল'জ, আইন মন্ত্রণালয়), উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, টুনটুনির বই (বাংলা উইকিসংকলন), উইকিপিডিয়া (কমন টেইলরবার্ড, Orthotomus, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী)





মন্তব্য
(০)