সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

‘নদীর সব জাটকা ধরা হয়ে গেছে’: নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চাঁদপুরে জাটকা নিধনের অভিযোগ

২০২৬ সালের এপ্রিলে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনার জেলে ও স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই মাসের অভয়াশ্রম নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রকাশ্যে জাটকা ধরা ও বিক্রি হচ্ছে; উপজেলা মৎস্য দপ্তর জানায়, এক মাসে ১৪০ জন জেলে আটক হয়েছেন।

‘নদীর সব জাটকা ধরা হয়ে গেছে’: নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চাঁদপুরে জাটকা নিধনের অভিযোগ
মৎস্য

চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে মার্চ-এপ্রিলের দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও ইলিশের পোনা জাটকা ধরা ও বিক্রি থামেনি বলে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি অভিযোগ করেন জেলে ও স্থানীয় বাসিন্দারা। জাগো নিউজের চাঁদপুর প্রতিনিধি শরীফুল ইসলাম দুই নদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ২০২৬ সালের ১৭ এপ্রিল প্রতিবেদন করেন যে জেলেরা অবাধে জাটকা ধরছেন, আর অনেক জায়গায় টহল বোটের দেখা মেলেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এই নিধন চলছে। চাঁদপুর সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জানান, যৌথ টহল চব্বিশ ঘণ্টা চলছে এবং আগের এক মাসে ১৪০ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করা হয়েছে।

নদীতে যা দেখা গেছে


জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদ্মা-মেঘনার বিভিন্ন এলাকায় জেলেদের অবাধে জাল ফেলতে দেখা যায়। অনেক জায়গায় নৌ পুলিশ বা কোস্ট গার্ডের নিয়মিত টহলের উপস্থিতি চোখে পড়েনি। কোথাও কোথাও টহল বোট দেখা গেলেও সে সময় মাছ ধরায় ব্যস্ত জেলেদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনেই প্রকাশ্যে জাটকা ধরা হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, অভিযানের খবর আগেভাগে ফাঁস হয়ে যায়, ফলে জেলেরা সহজে সরে পড়েন এবং অভিযান অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। এগুলো স্থানীয়দের অভিযোগ; এই নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার আলাদা কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে ছিল না, মৎস্য কর্মকর্তার টহলের বিবরণ ছাড়া।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রাতের আঁধারে চাঁদপুর সদর, হাইমচর ও মতলব উত্তর উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে জেলেরা জাল ফেলছেন, আর ধরা পড়া জাটকা বিক্রি হচ্ছে নদীপাড়ের হাট-বাজার ও পাড়া-মহল্লায়। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত স্থানীয় সূত্রের দাবি, কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এই কার্যক্রম চলছে, আর সে কারণেই অভিযান সত্ত্বেও তা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। কোনো ব্যক্তি বা দলের নাম বলা হয়নি, দাবিটিও আলাদাভাবে যাচাই হয়নি।

জেলেদের কথা


মেঘনাপাড়ের দুই জেলে ইউনুস ও আব্দুল আউয়াল জাগো নিউজকে বলেন, ‘এবছর জাটকা রক্ষা অভিযান নেই বললেই চলে। কারেন্ট জালসহ জেলেরা বিভিন্ন জাল দিয়ে নদীতে মাছ ধরছেন।’

তাঁদের একজন বলেন, ‘আগে স্পিডবোট দিয়ে টহল দিলেও এখন আসে না। নদীর সব জাটকা এবছর ধরা হয়ে গেছে। আমরা যারা বড় জাল দিয়ে মাছ ধরি, মনে হয় না সামনে ইলিশ পাবো। এ বিষয়ে সরকারের নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার।’ তাঁর কথার পেছনে বাস্তব হিসাব আছে: বছরের পরের দিকে বড় ফাঁসের জালে যে বড় ইলিশ ধরা পড়ে, তা নির্ভর করে বসন্তের জাটকা বেঁচে থেকে বড় হওয়ার ওপর।

খাদ্য সহায়তা নিয়ে জেলেদের অসন্তোষও নতুন নয়। ২০২৬ সালের নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি আইটিভি জানায়, চাঁদপুরের জেলেরা বলছেন, যে চাল তাঁরা পান তা যথেষ্ট নয়। দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত ইউএনবির প্রতিবেদনেও একই অভিযোগ ছিল: আনন্দবাজারের জেলেরা বলেছিলেন, তাঁরা নিষেধাজ্ঞা মানবেন, কিন্তু জিনিসপত্রের চড়া দামে ৪০ কেজি খাদ্য সহায়তায় চলে না; মেঘনাপাড়ের এক গ্রামের দুই জেলে নদী বন্ধের সময় অন্য আয় না থাকায় সহায়তা দ্বিগুণ করার দাবি জানিয়েছিলেন।

চাঁদপুরে মা ইলিশ রক্ষায় ব্যবহৃত স্পিডবোট, অক্টোবর ২০১৯; প্রতীকী ছবি, এই প্রতিবেদনের ঘটনার সময় তোলা নয়। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁদপুরে মা ইলিশ রক্ষায় ব্যবহৃত স্পিডবোট, অক্টোবর ২০১৯; প্রতীকী ছবি, এই প্রতিবেদনের ঘটনার সময় তোলা নয়। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

অভয়াশ্রম ও মার্চ-এপ্রিলের নিষেধাজ্ঞা


যে এলাকার কথা, সেটি দেশের ইলিশ অভয়াশ্রমগুলোর একটি। প্রতি বছর ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত পদ্মা-মেঘনার প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। নিষেধাজ্ঞা শুধু ইলিশে সীমিত নয়: এই দুই মাস অভয়াশ্রমে যেকোনো মাছ ধরা, বেচাকেনা, মজুত ও পরিবহন নিষিদ্ধ। দৈনিক ইনকিলাবের মতলব উত্তর প্রতিনিধি ২০২৬ সালের ১ মার্চ এই সময়টিকে এই জলসীমায় ইলিশের প্রধান প্রজনন ও বেড়ে ওঠার মৌসুম হিসেবে উল্লেখ করেন।

আইটিভি ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জানায়, চাঁদপুর সদর, হাইমচর, মতলব দক্ষিণ ও মতলব উত্তর, এই চার উপজেলার ৪৭ হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলে নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে ৩৯ হাজার ৪০০ জন চার মাস ধরে মাসে ৪০ কেজি করে চাল পাবেন। জেলা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম আইটিভিকে বলেন, মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে ১২টি স্পিডবোট দিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা টহল চলবে। জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল বারী জমাদার মানিক সচেতনতা ও আইন প্রয়োগ দুটিই জোরদারের আহ্বান জানান।

ইনকিলাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু মতলব উত্তর উপজেলাতেই নিবন্ধিত জেলে ৯ হাজার ১০০ জন, আর সরকারের ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির আওতায় তাঁদের প্রত্যেকের চার কিস্তিতে ১৬০ কেজি চাল পাওয়ার কথা। উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস জানান, ১ মার্চ থেকে মেঘনায় জাটকাবিরোধী অভিযান শুরু হবে, যা স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, নৌ পুলিশ ও কোস্ট গার্ড যৌথভাবে বা আলাদাভাবে পরিচালনা করবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, জেলেদের জাটকা নিধন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং টাস্কফোর্স নিয়ম ভঙ্গকারী জেলেদের নদী থেকে দূরে রাখতে সব ব্যবস্থা নেবে।

অভয়াশ্রমের এই নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘদিনের বার্ষিক ব্যবস্থা। ইউএনবি ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জানিয়েছিল, সে বছরও ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল একই ৭০ কিলোমিটার এলাকায় জেলার প্রায় ৪৪ হাজার নিবন্ধিত জেলের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল; ভিজিএফের আওতায় চার মাস মাসে ৪০ কেজি চাল, চাঁদপুর ও হাইমচরে টাস্কফোর্স এবং দিনরাত নৌ পুলিশের টহলের ব্যবস্থা ছিল। ২০২৪ সালে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা বলা হয়েছিল ৪৩ হাজার।

২০২৬ সালের এপ্রিলে আইনে যা ছিল


এসব নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০। এই আইন সরকারকে প্রজ্ঞাপন দিয়ে নির্ধারিত আকারের চেয়ে ছোট মাছ ধরা, বহন, পরিবহন বা বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা নিষিদ্ধ করার এবং মাছ ধরা নিয়ে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল তারিখের মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ২৫ নং আইন) দিয়ে আইনটি সংশোধন করা হয়, যা অবিলম্বে কার্যকর হয়। এই আইন একই বিষয়ে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের দুটি অধ্যাদেশ রহিত করে।

এই প্রতিবেদনের দিনে আইনটি যে অবস্থায় ছিল, তাতে আইনের অধীন বিধি বা প্রজ্ঞাপিত নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের শাস্তি সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, বা উভয় দণ্ড। মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গে কমপক্ষে এক বছর থেকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা; সেটি ছিল ৫ ধারার পুরোনো ভাষ্য, যা ২০২৬ সালের সংশোধনীতে বদলে যায়।

কারেন্ট জাল, অর্থাৎ জাটকা ধরতে প্রায়ই ব্যবহৃত সূক্ষ্ম মনোফিলামেন্ট ফাঁসজাল নিয়ে আইনে আলাদা ধারা আছে। ২০০২ সাল থেকে কারেন্ট জাল তৈরি, আমদানি, বাজারজাত, মজুত, বহন, পরিবহন, মালিকানায় রাখা, দখলে রাখা বা ব্যবহার নিষিদ্ধ। ২০২৬ সালের সংশোধনীর পর কারেন্ট জাল তৈরি, আমদানি, বাজারজাত বা মজুতের শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা; আর বহন, পরিবহন, মালিকানা, দখল বা ব্যবহারের শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা, বা উভয় দণ্ড।

২০২৬ সালের সংশোধনীতে অভয়াশ্রমের ধারণাও সরাসরি আইনে যুক্ত হয়। এতে ‘মৎস্য অভয়াশ্রম’ বলতে বোঝানো হয় সরকারি গেজেটে ঘোষিত এমন কোনো এলাকা বা পুরো জলাশয়, যেখানে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী সুরক্ষিত থাকে, যাতে তারা নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশে প্রজনন করতে, বেড়ে উঠতে ও অবাধে চলাচল করতে পারে। সরকারকে এমন অভয়াশ্রম ঘোষণার ক্ষমতাও দেওয়া হয়, যেখানে স্থায়ীভাবে বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা যাবে।

চাঁদপুরে জব্দ করা নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, পোড়ানোর আগে স্তূপ করে রাখা, জুন ২০১৯। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁদপুরে জব্দ করা নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, পোড়ানোর আগে স্তূপ করে রাখা, জুন ২০১৯। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

অভিযান নিয়ে কর্মকর্তাদের বক্তব্য


চাঁদপুর সদর উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক জাগো নিউজকে জানান, মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড ও নৌ পুলিশের সমন্বয়ে নদীতে টহল চলছে। তিনি বলেন, মৎস্য বিভাগ পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা অভিযান চালিয়েছে, আগের এক মাসে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় ১৪০ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ হয়েছে।

এমন একটি অভিযানের বিস্তারিত দুই সপ্তাহ আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। ঢাকা টাইমস ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল জানায়, ১ এপ্রিল বিকেল ৫টা থেকে ২ এপ্রিল রাত ২টা পর্যন্ত চাঁদপুর সদরের মেঘনায় আখনেরহাট থেকে বহরিয়া পর্যন্ত টাস্কফোর্সের অভিযানে জাটকা ধরার সময় ৩২ জন জেলেকে হাতেনাতে আটক করা হয়। তাঁদের ২৬ জনের বিরুদ্ধে মৎস্য আইনে নিয়মিত মামলা দিয়ে নৌ থানায় পাঠানো হয়; অসুস্থ দুজন ও চার শিশু-কিশোরকে মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযানে দুটি নৌকা, প্রায় পাঁচ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ও প্রায় ২০ কেজি জাটকা জব্দ হয়; জাটকা দুস্থদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ওমর ফারুক অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ১০টি নিয়মিত মামলা হয়েছে।

জাতীয় চিত্র তুলে ধরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল, জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের আগে। ইউএনবির তথ্যমতে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ১৮ জেলার ৯৬ উপজেলায় ৩০ দিনের ‘বিশেষ কম্বিং অপারেশন ২০২৬’ এবং মার্চে ৭৯ উপজেলায় ১৫ দিনের অভিযান চালানো হয়; কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালের বিরুদ্ধে জুন পর্যন্ত অভিযান চলার কথা জানানো হয়।

চাঁদপুর থেকে আগের মৌসুমগুলোতেও একই ধরনের খবর এসেছে। দৈনিক ইনকিলাব ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল জানায়, হাইমচরে অভয়াশ্রমে জাটকা ধরার দায়ে টাস্কফোর্স ৬০ জন জেলেকে আটক করে, তাঁদের ৪৪ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং এলাকায় জব্দ করা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল পুড়িয়ে ফেলা হয়।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মো. আমিন উর রশিদ ১৭ এপ্রিলের প্রতিবেদনের জন্য জাগো নিউজকে বলেন, দেশের ইলিশ সম্পদ রক্ষায় জাটকা সংরক্ষণে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং এ বিষয়ে আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করা হয়েছে।

ইলিশের জন্য জাটকা কেন গুরুত্বপূর্ণ


জাটকা হলো দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের (Tenualosa ilisha) পোনা। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় ইলিশ হেরিং গোত্রের অভিপ্রয়াণী (অ্যানাড্রোমাস) মাছ: পূর্ণবয়স্ক ইলিশ পদ্মা, যমুনা, মেঘনাসহ বড় নদীর উজানে মিঠা পানিতে ডিম ছাড়ে, আর পোনা ভাটিতে সাগরে নেমে খেয়ে বড় হয়, তারপর পরিণত হয়ে ফেরে। ইলিশ বছরের বেশির ভাগ সময় ডিম ছাড়ে; ফেব্রুয়ারি-মার্চে ছোট এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রধান প্রজনন মৌসুম। একটি বড় স্ত্রী ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম ধারণ করতে পারে। মৎস্য গবেষণার ভিত্তিতে উইকিপিডিয়া জানায়, ডিম ছাড়তে পূর্ণবয়স্ক ইলিশ নদীর উজানে ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যায়; পুরুষ ইলিশ সাধারণত ২৬ থেকে ২৯ সেন্টিমিটার এবং স্ত্রী ইলিশ ৩১ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার আকারে প্রজননক্ষম হয়।

পোনারা বড় ঝাঁকে নদী বেয়ে নামে বলে এদের ধরা সহজ। বাংলাপিডিয়া জানায়, সাগরমুখী এই যাত্রায়, প্রধানত ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসে, জগৎবেড় জাল, কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালে বিপুল পরিমাণ জাটকা ধরা পড়ে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ১৯৯২-৯৪ সালের এক জরিপে হিসাব করা হয়েছিল, প্রতি জানুয়ারি-এপ্রিল মৌসুমে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টন জাটকা ধরা হয়, যার অর্ধেকের বেশি মেঘনা থেকে। আগের দশকগুলোতে ইলিশ কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে বিশ্বকোষটি জাটকার অতি-আহরণকে রেখেছে, সঙ্গে পলি জমা, দূষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প ও নার্সারি এলাকা হারিয়ে যাওয়া।

চাঁদপুরে বিএফআরআইয়ের নদী গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিছুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আজকের জাটকা আগামী দিনের বড় ইলিশ। নির্বিচারে নদীতে জাটকা ধরলে আগামীতে ইলিশ উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এভাবে জাটকা নিধন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন ইলিশ রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। জাটকার ৭০-৮০ শতাংশ রক্ষা করা গেলে দেশে ইলিশ উৎপাদন প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা সম্ভব হবে।’

এর আগেও তিনি এ নিয়ে কথা বলেছেন। ইউএনবির খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দূষণ ও নদী থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কথা বলেন। ২০২৬ সালের ১ মার্চ দৈনিক ইনকিলাবকে তিনি বলেন, শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ইলিশ উৎপাদন বাড়বে না; জেলেদের আর্থিক নিরাপত্তা না থাকলে নিষেধাজ্ঞার সুফল দীর্ঘমেয়াদে টিকবে না।

চাঁদপুরের বড় স্টেশন মোলহেড, যেখানে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদী মিলেছে, জুলাই ২০১৯। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁদপুরের বড় স্টেশন মোলহেড, যেখানে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদী মিলেছে, জুলাই ২০১৯। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

প্রতিবেদনের আগে ইলিশ উৎপাদন ও জাতীয় বিধিনিষেধ


প্রতিবেদনটি এসেছিল ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার সময়ে। দৈনিক দেশ রূপান্তরে ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল প্রকাশিত মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, উৎপাদন ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে ওঠে, তারপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৫ লাখ টনে নামে, যা আট বছরে সর্বনিম্ন। মন্ত্রী আমিন উর রশিদ ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ২০২৪-২৫ সালের হিসাবটি দেন এবং উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হওয়ার কারণ হিসেবে নদীতে পলি জমা, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ ও মৎস্য সম্পদের ওপর বাড়তি চাপের কথা বলেন।

একই ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয় জানায়, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ ইলিশ এবং জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১ শতাংশ; বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি ইলিশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে, ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম। প্রায় ৬ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে যুক্ত, আর পরিবহন, বেচাকেনা, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে যুক্ত আরও ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ। ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়।

মন্ত্রণালয়ের তালিকা অনুযায়ী ২০২৬ সালের এপ্রিলে কার্যকর প্রধান সুরক্ষাব্যবস্থাগুলো ছিল:

  • ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা, পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
  • ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রম, নির্ধারিত এলাকায় মৌসুমি মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞাসহ; চাঁদপুরের মার্চ-এপ্রিলের নিষেধাজ্ঞা এর একটি।
  • প্রধান প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ।
  • ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন বঙ্গোপসাগরে ৫৮ দিন সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ।
  • ৩ হাজার ১৮৮ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা।
  • প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার জেলে পরিবারকে চার মাস মাসে ৪০ কেজি করে চাল, সঙ্গে বিকল্প আয়ের জন্য প্রশিক্ষণ, উপকরণ ও অন্যান্য সহায়তা।

২০২৬ সালের জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালিত হয় ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল, প্রতিপাদ্য ছিল ‘জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী’; উদ্বোধন হয় চাঁদপুর সদরে, কর্মসূচি চলে ইলিশসমৃদ্ধ ২০ জেলায়। ৬ এপ্রিলের ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানান, প্রথমবারের মতো ৪০ হাজার জেলে দুই মাসের জন্য চাল, আটা, তেল, ডাল, চিনি ও আলুর একটি খাদ্য প্যাকেজ পাবেন, যার মূল্য পরিবারপ্রতি প্রায় ৬ হাজার টাকা। নদী থেকে জাগো নিউজের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় সপ্তাহটি শেষ হওয়ার চার দিন পর, যখন অভয়াশ্রমের নিষেধাজ্ঞার আরও দুই সপ্তাহ বাকি।

চাঁদপুর শহরের ইলিশ ভাস্কর্য, অক্টোবর ২০২২। ছবি: TahidGP / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁদপুর শহরের ইলিশ ভাস্কর্য, অক্টোবর ২০২২। ছবি: TahidGP / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

চাঁদপুর: পদ্মা-মেঘনার মিলনস্থল


চট্টগ্রাম বিভাগের চাঁদপুর জেলা ‘ইলিশের বাড়ি’ নামে পরিচিত। মেঘনার পূর্ব তীরের এই জেলায় আটটি উপজেলা: চাঁদপুর সদর, ফরিদগঞ্জ, হাইমচর, হাজীগঞ্জ, কচুয়া, মতলব দক্ষিণ, মতলব উত্তর ও শাহরাস্তি। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার আয়তন ১ হাজার ৬৪৫ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার; ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪৮। চাঁদপুর মহকুমা হয় ১৮৭৮ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। অভয়াশ্রম যেখানে শেষ, জেলার দক্ষিণের সেই হাইমচর উপজেলার আয়তন ১৩৪ দশমিক ১৬ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ছয়টি; আর যেখানে শুরু, সেই মতলব উত্তরের আয়তন ২৬০ দশমিক ২৯ বর্গকিলোমিটার।

শহরটি দাঁড়িয়ে আছে মোলহেড বা বড় স্টেশন নামে পরিচিত মিলনস্থলে, যেখানে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া মিলেছে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, ষাটনলের ভাটিতে আপার মেঘনা লোয়ার মেঘনায় পরিণত হয়, আর গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র-যমুনার মিলিত প্রবাহ নিয়ে পদ্মা ষাটনল থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে চাঁদপুরের কাছে মেঘনায় মেশে; বর্ষায় এই মোহনা প্রায় ১১ কিলোমিটার চওড়া হয়। এরপর লোয়ার মেঘনা প্রায় ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণে তেঁতুলিয়ার দিকে বয়ে যায়। জুন থেকে অক্টোবরে চাঁদপুরে মেঘনার গড় প্রবাহ প্রায় ২৫ লাখ কিউসেক, আর নদীটি বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টন পলি বহন করে।

পলিবাহী এই চওড়া নদীপথ সাগরমুখী জাটকার বেড়ে ওঠা ও চলাচলের পথ। সে কারণেই বসন্তে চাঁদপুরের এই অংশে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়, আর মার্চ-এপ্রিলে এখানে যা ঘটে, তার প্রভাব পড়ে পরের মৌসুমগুলোর ইলিশ আহরণে।

ছবি: AsikBinRahim / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা টাইমস, আইটিভি, দৈনিক ইনকিলাব, ইউএনবি, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দেশ রূপান্তর, বাংলাদেশের আইন (মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ ও সংশোধন আইন, ২০২৬), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

মৎস্য

সম্পর্কিত খবর

মৎস্য

কেরালার উপকূলীয় নারীদের ৮৪টি মাছের ব্যবসা, পারিবারিক আয় বেড়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ

আইসিএআর-সিএমএফআরআইয়ের এক কর্মসূচির সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালে কেরালার আট জেলায় ৮৪টি মৎস্যভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে উঠেছে; সরাসরি উপকৃত ৪৬৯ জন, যাঁদের বেশির ভাগ তফসিলি জাতিভুক্ত।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

সৌরশক্তির রিসার্কুলেটিং ট্যাংকে পাহাড়ে ট্রাউট চাষ, পানি লাগবে ৮০ শতাংশ কম

ভারতের উত্তরাখণ্ডের এক খামারে সৌরশক্তিচালিত হাইব্রিড রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম চালু করেছে আইসিএআর-সিআইসিএফআর; প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে পানি প্রায় ৮০ শতাংশ কম লাগে এবং একজন ট্রাউটচাষি বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি উদ্বৃত্ত পেতে পারেন।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

আট পদের পাঁচটিই শূন্য, তিনজনে চলছে শায়েস্তাগঞ্জের সরকারি মৎস্য বীজ খামার

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে ১২টি পুকুরে পোনা উৎপাদন চললেও আট পদের পাঁচটি শূন্য, নৈশপ্রহরী নেই, বরাদ্দ না থাকায় চাষি প্রশিক্ষণও বন্ধ।

মানবজমিন১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)