২০২৫ সালের ২৯ জুলাই, মঙ্গলবার, বিশ্ব বাঘ দিবসে বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা অডিটোরিয়ামে ‘সুন্দরবন বাঁচাও, বাঘ বাঁচাও’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. নূর আলম শেখ দাবি করেন, গত ২৫ বছরে ৩০টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর হিসাবে এর মধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে মাত্র ১০টির, আর ১৪টি বাঘকে স্থানীয় মানুষ পিটিয়ে মেরেছে। সকালের এই সভার আয়োজক ছিল ধরা, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ ও পশুর রিভার ওয়াটারকিপার।
সভায় বক্তারা যা বললেন
নূর আলম শেখ পশুর রিভার ওয়াটারকিপার ও সুন্দরবন রক্ষায় আমরা-র সমন্বয়কারী; সভাটি তিনিই সঞ্চালনা করেন। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেন, ‘বাঘ মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসন করে আমাদের সবাইকে বাঘ বন্ধু হতে হবে।’
বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও দূষণের কবল থেকে বাঘের আবাসস্থল সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে। তাঁদের ভাষ্য, বিষযুক্ত পানি পান করে বাঘ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, তাই সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগকারী ও বাঘ পাচারকারীদের রুখতে হবে। সংকটাপন্ন এই প্রাণী রক্ষায় তাঁরা সমন্বিত উদ্যোগ ও পরিকল্পনার দাবি জানান।
সভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক কৃষিবিদ মোহাম্মদ শামীমুর রহমান শামীম, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস এম মাসুদ রানা, উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আহসান হাবিব হাসান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু হানিফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অতিথির বক্তব্যে শামীমুর রহমান শামীম বাঘকে শৌর্যবীর্য ও সাহসের প্রতীক বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, জাতীয় ক্রিকেট দলের লোগোও বাংলার বাঘ; সুন্দরবন বাঁচলে বাঘ বাঁচবে। সভা শেষে তিনি ‘সুন্দরবনের বাঘ’ বিষয়ক শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার দেন।

বাঘের মৃত্যু ও সংখ্যা নিয়ে একই দিনের অন্যান্য তথ্য
সভায় দেওয়া মৃত্যুর হিসাবটি বক্তার নিজের। একই দিনে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে ভিন্ন হিসাব আসে: ২০০১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার মারা গেছে; এর মধ্যে ৫৮টিকে পিটিয়ে বা শিকার করে হত্যা করা হয়েছে, ৩০টির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এবং ৩টি মারা গেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস জানায়, বাংলাদেশে বাঘ গণনায় ২০১৫ সালে ১০৬টি, ২০১৮ সালে ১১৪টি এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণনায় ১২৫টি বাঘ পাওয়া যায়। বন বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে ঢাকা পোস্ট ও কালবেলা জানায়, ২০২৩ সালে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট রেঞ্জের ৬৩৯টি গ্রিডে ক্যামেরা বসিয়ে গণনা হয় এবং পাঁচ বছরের ব্যবধানের দুই জরিপে বাঘ বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। একই দিন ঢাকা পোস্টকে নূর আলম শেখ বলেন, ২০১০ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের বাঘ সম্মেলনে ১২ বছরে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছিল, সে হিসাবে এই বৃদ্ধি নগণ্য। তাঁর দাবি, একটি আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র সুন্দরবনে সক্রিয় এবং তারা বাঘের দেহাংশসহ বিভিন্ন প্রাণী পাচারে জড়িত।
দ্বন্দ্বের অন্য পিঠে আছে মানুষের প্রাণহানি। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০০১ থেকে ২০২৫ সালে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে ৪২৫ জন মারা যান এবং ৯৫ জন আহত হন। সুন্দরবন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, দ্বন্দ্ব কমাতে ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে এবং খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় বনের ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নির্মাণের মধ্যে ৬০ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে।

বিশ্ব বাঘ দিবস ও সুন্দরবন
বাসসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ব্যাঘ্র সম্মেলনে বিশ্ব বাঘ দিবসের সূচনা হয় এবং প্রতি বছর ২৯ জুলাই দিনটি পালিত হয়। ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য ছিল ‘মানুষ-বাঘের সুরেলা সহাবস্থান’, আর দেশে স্লোগান ছিল ‘বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি, সুন্দরবনের সমৃদ্ধি’। বাসস আরও জানায়, সুন্দরবন এখন বাংলাদেশের বাঘের শেষ আশ্রয়স্থল; জলবায়ু পরিবর্তনে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য ও খাদ্যসংকটে এখানকার বাঘ হুমকিতে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার বদ্বীপে বঙ্গোপসাগরের তীরে থাকা সুন্দরবন পৃথিবীর বৃহত্তম অবিচ্ছিন্ন ম্যানগ্রোভ বন; এর মোট আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার, যার ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ওঠে। সভাস্থল মোংলা বাগেরহাট জেলার একটি উপজেলা; পশুর নদীর কাছে অবস্থিত মোংলা বন্দর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর।

ছবি: Dr. Raju Kasambe / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ঢাকা পোস্ট, কালবেলা, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)