ভারতে গরুর গোবর ও গোমূত্র দিয়ে তৈরি সাবান, ফেসওয়াশ, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট এমনকি পানীয় আমাজন, ফ্লিপকার্ট ও ই-বের মতো বড় অনলাইন বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি হচ্ছিল। হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি “Would you use a cow dung face wash? They do in India” শিরোনামে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা কলকাতার দৈনিক এই সময় তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব পণ্যের উদ্যোক্তাদের একজন, মুম্বাইয়ের প্রতিষ্ঠান কাওপ্যাথির বার্ষিক লেনদেন আড়াই কোটি রুপি।
মুম্বাইয়ের কাওপ্যাথি কী বানায়
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাওপ্যাথির প্রতিষ্ঠাতা মুম্বাইয়ের ৩৬ বছর বয়সী মাইক্রোবায়োলজিস্ট উমেশ সোনি। তিনি ২০১২ সাল থেকে গোবর দিয়ে সাবান তৈরি করছেন এবং কেবল দেশি জাতের গরুর গোবর ব্যবহার করেন। সোনির ভাষ্য, হাতে সংগ্রহ করা গোবর কারখানায় তাপ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যাতে জীবাণু না জন্মায়।
প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের মধ্যে আছে গোবর ও পোড়া ঘুঁটের ছাই দিয়ে তৈরি ট্যালকম পাউডারের বিকল্প; গোবর, পাতিত গোমূত্র ও স্টেভিয়া (উদ্ভিদজাত মিষ্টিকারক) দিয়ে তৈরি টুথপেস্ট; পাতিত গোমূত্রের আন্ডার-আই জেল; শেভিং ও শাওয়ার ক্রিম। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় পঞ্চগব্য, অর্থাৎ দুধ, দই, ঘি, গোবর ও গোমূত্রের মিশ্রণে তৈরি সাবান। সোনি জানান, শুরুর বছরগুলোতে তিনি মজুদের অর্ধেক উপহার দিয়ে দিতেন, পরে বিক্রি বাড়ে। তখন তিনি ভারতজুড়ে ৪০০ পাইকারি বিক্রেতাকে পণ্য দিতেন এবং ১৪টি দেশে রপ্তানি করতেন। সম্প্রতি তিনি ক্যাফেইনমুক্ত পানীয়ও এনেছিলেন: ভেষজ ও পাতিত গোমূত্রের তরল চা, আর শুকনো ঘুঁটের আগুনে ভাজা ভেষজের এক মিশ্রণ, যার স্বাদ হুবহু কফির মতো বলে তাঁর দাবি।

আরও উদ্যোক্তা ও সরকারি সহায়তা
একই প্রতিবেদনে তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ের ৪৯ বছর বয়সী কারিগর গণেশন পালসামির কথা আছে, যিনি নিজের দুটি গরুর গোবর ও মূত্র দিয়ে ১০০টির বেশি ধরনের হস্তশিল্প বানান। মুম্বাইয়ের রাজস পরাঞ্জপে ও গৌতমী দম্পতি ২০১৮ সালের আগস্টে বোধিশপ নামে উদ্যোগ শুরু করেন; তাঁরা গোবর ও গোমূত্রভিত্তিক জৈবসার, সানস্ক্রিন, ফেসওয়াশ ও সাবান বিক্রি করেন।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানায়, গরুজাত পণ্য (মাংস ও চামড়া বাদে) নিয়ে কাজ করা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে সরকার প্রাথমিক বিনিয়োগের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়। গরু সংরক্ষণের নীতি ও নির্দেশিকা তৈরির জন্য ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রীয় কামধেনু আয়োগ গঠিত হয়। স্ক্রল ডট ইন ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাতে জানায়, আয়োগের চেয়ারম্যান বল্লভভাই কাঠিরিয়া বলেছেন, গোবর ও গোমূত্র বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে চাওয়া স্টার্টআপ প্রাথমিক তহবিলের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি অর্থ পেতে পারে। তাঁর যুক্তি, এতে দুধ দেওয়া বন্ধ করা গরু ফেলে না দিতে মানুষ উৎসাহিত হবে।

স্বাস্থ্যগুণের দাবি ও বিজ্ঞান
এসব পণ্যের স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে যা বলা হয়, তা উদ্যোক্তাদের নিজস্ব দাবি। কারিগর পালসামির দাবি, তাঁর গরুর গোবর জীবাণুনাশক। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআর ২০১৮ সালের অক্টোবরে কাওপ্যাথি নিয়ে এক প্রতিবেদনে জানায়, উমেশ সোনি দাবি করেন গোবর একজিমা থেকে গ্যাংগ্রিন পর্যন্ত নানা চর্মরোগ সারায়; পঞ্চগব্য ক্যানসার ও ডায়াবেটিসসহ নানা রোগ সারায় বলেও বিশ্বাস প্রচলিত আছে। এনপিআর স্পষ্ট লিখেছে, এসব দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পুনের রোগপ্রতিরোধবিজ্ঞানী ভিনীতা বাল এনপিআরকে বলেন, “We are looking backward rather than looking forward” (আমরা সামনে না তাকিয়ে পেছনে তাকাচ্ছি)। কোনো চর্মরোগ বা অসুখে এসব পণ্যের ওপর ভরসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গরু ঘিরে সহিংসতার পটভূমি
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, ভারতে গরুর মর্যাদা ক্রমেই রাজনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে। হিন্দুধর্মে গরু পবিত্র প্রাণী হিসেবে গণ্য।
ছবি: WarmaFiesta / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: এই সময়, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, এনপিআর, স্ক্রল ডট ইন





মন্তব্য
(০)