২০২৫-২৬ সালের শীত মৌসুমে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দারা ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের মাঝের বিভাজকে শীতকালীন সবজি চাষ করেছেন। উপজেলার ভেতরে মহাসড়কের প্রায় ৪ কিলোমিটার জুড়ে সড়ক বিভাজকের আইল্যান্ড এখন একটি সবজি বাগান। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি এই খবর প্রকাশ করে। বিভাজকে চাষ করা সবজির মধ্যে ছিল শিম, লাউ, করলা, বেগুন, পেঁয়াজ, পেঁপে, মুলা, পালংশাক, লালশাক, ধনেপাতা ও মরিচ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি বিভাগের সহযোগিতা আর বিনা মূল্যে পাওয়া বীজ দিয়ে স্থানীয়রা এই অভিনব চাষাবাদ শুরু করেন। পত্রিকাটি জানায়, মাটির উর্বরতা ভালো হওয়ায় ফলন চমৎকার হয়েছে এবং তাতে চাষিদের আয়ও বেড়েছে: পরিবারগুলো নিজেরা সবজি খাচ্ছে, প্রতিবেশীদের দিচ্ছে, কিছু বাজারে বিক্রিও করছে, আর এতে স্থানীয়দের বাড়তি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানান, অফিস থেকে চাষিদের পরামর্শ ও কৌশলগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
সড়কের আইল্যান্ড এখন সবজির বাগান
জাগো নিউজের গাইবান্ধা প্রতিনিধি সরেজমিনে যা দেখেছেন, তা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়: উপজেলার ভেতরে মহাসড়কের প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সড়কের মাঝখানে নানা জাতের সবজির সমারোহ, আর এসব সবজি চাষ করছেন এলাকারই বাসিন্দারা। প্রতিবেদনে বলা হয়, রং-বেরঙের এসব শাক-সবজি মহাসড়কের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সাধারণ মানুষ এখান থেকে তরতাজা শাক-সবজি পাচ্ছেন।
এলাকাবাসী ও পথচারীরা পত্রিকাটিকে জানান, বিভাজকের ওপরের অংশ খালি পড়ে থাকায় কিছু উৎসাহী মানুষ সেখানে বিভিন্ন জাতের শাক-সবজির চাষ শুরু করেন। এতে পরিবারের খাদ্য চাহিদা মেটার পাশাপাশি কিছু সবজি বাজারেও যাচ্ছে। তাঁদের ভাষায়, আগে সড়কের এই আইল্যান্ড ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকত, এখন সেখানে রং-বেরঙের শাক-সবজির সমারোহ, যা দেখতেও তাঁদের ভালো লাগছে।
বিভাজকে কতজন সবজি চাষ করছেন, মোট কতটুকু জায়গায় ফসল আছে, কত সবজি তোলা হয়েছে বা কত টাকা আয় হয়েছে, প্রতিবেদনে তার কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি; ঠিক কবে চাষ শুরু হয়েছিল, তাও বলা হয়নি। দেশের মহাসড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) কিংবা হাইওয়ে পুলিশের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে ছিল না, আর চাষিরা সওজের অনুমতি নিয়েছিলেন কি না, তাও জানানো হয়নি।
চাষি ও ট্রাকচালক যা বললেন
বিভাজকে যাঁরা সবজি লাগিয়েছেন, তাঁদের একজন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের একটি, তালুককানুপুর ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের রোড ডিভাইডারের বেশ কিছু জায়গা পরিত্যক্ত ছিল। এই স্থানে লাউশাক, পালংশাক, লালশাকসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করেছি। কৃষি বিভাগের সহায়তায় সবজির ভালো ফলনও হয়েছে। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবেশীদের মাঝে বিতরণসহ বিক্রিও করছি।’
আরেক কৃষক শামীম মিয়া বলেন, ‘সড়কের মাঝের জায়গাগুলো দীর্ঘদিন ধরে দেখছি পড়ে আছে। এখানে কিছুই লাগানো হয়নি। নোংরা হয়ে পড়েছিল। এগুলো পরিষ্কার করে এ বছর শিম, লাউ, করলা, বেগুন, মরিচসহ হরেক রকমের সবজি চাষ করে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মিটিয়েছি। বিক্রি করেছি বাজারেও। প্রতিবেশীরাও খাচ্ছেন।’
এই মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী ট্রাকচালক মো. রাজু আহমেদও পত্রিকাটির সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এই রাস্তায় ট্রাক চালাই। গোবিন্দগঞ্জের এই অংশে এলে মন ভালো হয়ে যায়। রাস্তার মাঝখানে সবুজের সমারোহ দেখতে ভালোই লাগে।’
উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একমাত্র সরকারি কর্মকর্তা গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বিলাস কুমার ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘মহাসড়কের বিভাজকের পরিত্যক্ত জায়গায় সবজি চাষে কৃষকের আগ্রহ দেখে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস থেকে পরামর্শ ও কৌশলগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।’
উপজেলা কৃষি অফিসটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অংশ। ডিএই বাংলাদেশে কৃষি সম্প্রসারণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি দপ্তর; এটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে এবং এর প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। ১৯৮২ সালে ছয়টি সংস্থা একীভূত করে অধিদপ্তরটি গঠিত হয়: কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), পাট পরিদপ্তর, উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট। ১৯৯৬ সালে গৃহীত নতুন কৃষি সম্প্রসারণ নীতি অধিদপ্তরের কাজের পরিকল্পনায় দিকনির্দেশনা দেয়।
কোন কর্মসূচির আওতায় চাষিরা বিনা মূল্যে বীজ পেয়েছেন, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি। ক্ষুদ্র চাষিদের মধ্যে বীজ ও অন্যান্য উপকরণ বিতরণে ডিএই একাধিক কর্মসূচি চালায়। এর একটি ‘অনাবাদি পতিত জমি ও বসত বাড়ির আঙিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্প (১ম সংশোধিত)’। গাইবান্ধার পশ্চিম সীমান্তের জেলা দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে এই প্রকল্প নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দৈনিক দেশ রূপান্তর জানায়, ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল বিরামপুর উপজেলা কৃষি অফিস ৩৬ জন কৃষকের মাঝে জৈব সার, ফলের চারা এবং নেটসহ তিন মৌসুমের ২২ প্রকার সবজির বীজ বিনা মূল্যে বিতরণ করে, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ওই উপজেলায় এই প্রকল্পের আওতায় ১০০ জন কৃষক উপকরণ ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছেন। বিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কমল কৃষ্ণ রায় পত্রিকাটিকে বলেন, ‘নিরাপদ সবজি উৎপাদনে পারিবারিক পুষ্টি বাগান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।’
গোবিন্দগঞ্জ: গাইবান্ধার সবচেয়ে বড় উপজেলা
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার আয়তন ২,১১৪.৭৭ বর্গকিলোমিটার এবং এতে উপজেলা সাতটি। বাংলাপিডিয়া গোবিন্দগঞ্জকে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং পলাশবাড়ীকে সবচেয়ে ছোট উপজেলা বলে উল্লেখ করেছে। উপজেলাটি নিয়ে লেখা নিবন্ধে গোবিন্দগঞ্জের আয়তন ৪৬০.৪২ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ৫,১৪,৬৯৬ জন দেখানো হয়েছে। উপজেলাটির উত্তরে ঘোড়াঘাট ও পলাশবাড়ী, দক্ষিণে সোনাতলা ও শিবগঞ্জ, পূর্বে সাঘাটা ও পলাশবাড়ী এবং পশ্চিমে পাঁচবিবিসহ অন্যান্য উপজেলা। ১৯১২ সালে গোবিন্দগঞ্জ থানা গঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে তা উপজেলায় রূপান্তরিত হয়।
উপজেলার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, বাকিটা নদী-অববাহিকার দেশ। এখানকার প্রধান নদী করতোয়া, বাঙালি ও নলুয়া, আর উল্লেখযোগ্য জলাভূমি সাত বিল। করতোয়া নদী নিয়ে বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধে বলা হয়েছে, যমুনেশ্বরী-করতোয়া দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব দিকে বয়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় পৌঁছায়, সেখানে এর মূল ধারা পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে কাটাখালী হয়ে বাঙালি নদীতে পড়েছে।
বাংলাপিডিয়া বরেন্দ্রভূমিকে বঙ্গীয় অববাহিকার বৃহত্তম প্লাইস্টোসিন ভূপ্রাকৃতিক একক বলে বর্ণনা করেছে; প্রাচীন পলিমাটির এই অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৭,৭৭০ বর্গকিলোমিটার এবং এর পূর্ব সীমা করতোয়া নদী। জ্ঞানকোষটির বর্ণনায় এখানকার জলবায়ু চরমভাবাপন্ন: গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১,৯৭১ মিলিমিটার, যার বেশির ভাগ হয় বর্ষায়; অঞ্চলটি খরাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত, আর শীতকালে দিনাজপুর ও রংপুর জেলার কোনো কোনো স্থানে তাপমাত্রা প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়।
উপজেলার অর্থনীতিতে কৃষিরই প্রাধান্য। বাংলাপিডিয়া প্রধান আয়ের উৎসগুলোর মধ্যে কৃষির অংশ দেখিয়েছে ৬৬.৯২ শতাংশ। প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, ভুট্টা, আখ, গম, আলু, সরিষা ও শাকসবজি এবং প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, নারিকেল, পেঁপে, বাঙ্গি ও তরমুজের নাম দেওয়া হয়েছে। কৃষিজমির মালিকানা প্রসঙ্গে একই নিবন্ধে ভূমিমালিক ৫৯.৪৩ শতাংশ এবং ভূমিহীন ৪০.৫৭ শতাংশ দেখানো হয়েছে।

চার লেনে উন্নীত হচ্ছে মহাসড়ক
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের যে অংশ গোবিন্দগঞ্জের ভেতর দিয়ে গেছে, সেটি এলেঙ্গা-রংপুর সড়কের অংশ। দক্ষিণ এশিয়া উপআঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক) সড়ক সংযোগ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে সওজ এই সড়ক চার লেনে উন্নীত করছে। ২০২৪ সালের ২৬ মার্চ দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, প্রকল্পটি এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৯০.২ কিলোমিটার সড়কজুড়ে এবং এটি সাসেকের প্রথম প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ, যে প্রকল্পে টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা অংশ প্রশস্ত করা হয়েছিল।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রথম অনুমোদিত হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে, ১১৮.৯৯ বিলিয়ন টাকা ব্যয়ে; ২০২০ ও ২০২১ সালে সংশোধনে ব্যয় দাঁড়ায় ১৬৬.৬২ বিলিয়ন টাকায়, আর ২০২২ সালের নভেম্বরের সংশোধনে ১৯০.১৬ বিলিয়ন টাকায়। প্রকল্পে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা ও রংপুর জেলায় ৩২৬ হেক্টর জমি লেগেছে। পরে তিনটি স্থানে টোল প্লাজা এবং এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র যুক্ত করা হয়; পত্রিকাটির ভাষায়, এতে করিডোরটি প্রায় প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত ও টোলভিত্তিক হয়ে উঠবে।
পত্রিকাটি জানায়, চার লেনে প্রশস্তকরণ ও দুই লেনের সার্ভিস সড়কের কাজ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল, তবে এলেঙ্গা ও গোবিন্দগঞ্জের দুটি উড়ালসড়ক এবং হাটিকুমরুল ইন্টারচেঞ্জ ততদিনে শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর কথা ছিল। গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় জমি বুঝিয়ে না দেওয়ায় গোবিন্দগঞ্জ উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ তখনো শুরু হয়নি। সে সময় প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ছিল ৭৩ শতাংশ; প্রকল্প পরিচালক ড. ওয়ালিউর রহমান বলেছিলেন, সড়কটি চালু হলে ঢাকা থেকে রংপুর যেতে প্রায় চার ঘণ্টা লাগবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির জাগো নিউজের প্রতিবেদনে সবজিভরা বিভাজকটি সড়কের কোন অংশের, তা বলা হয়নি।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সওজ ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থাটি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীনে কাজ করে, এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার তেজগাঁওয়ে, আর বাংলাদেশের মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এর।

বিভাজকে যেসব শীতের সবজি
বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ১০০ রকমের সবজি চাষ হয় এবং পুষ্টি, আয় ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সবজি গুরুত্বপূর্ণ; জ্ঞানকোষটিতে জনপ্রতি দৈনিক সবজির প্রয়োজন ২০০ গ্রাম বলে উল্লেখ আছে। প্রধান শীতকালীন সবজি হিসেবে সেখানে বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, বেগুন, মুলা, শিম ও লাউয়ের নাম এসেছে; বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, ঢেঁড়স ও লালশাক দুই মৌসুমেই জন্মে, আর প্রতিকূল আবহাওয়া ও পোকামাকড়ের আক্রমণ গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষকে সীমিত রাখে। গোবিন্দগঞ্জের বিভাজকে লাগানো ফসলের বেশির ভাগই এই শীতকালীন দলের।
দেশি শিম (Lablab niger) সম্পর্কে বাংলাপিডিয়া বলছে, এটি শীতকালীন সবজি, সারা দেশেই চাষ হয় এবং এতে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আমিষ ও ভিটামিন সি প্রচুর। জুন থেকে আগস্টে চারা মাঠে রোপণ করা হয়, ৮০ থেকে ৯০ দিনে ফসল তোলার উপযোগী হয়, আর হেক্টরপ্রতি শিমের গড় ফলন ১০ থেকে ১২ টন। শিমের শুঁটি সবজি হিসেবে রান্না হয়, শুকনো বীজ দিয়েও নানা পদ তৈরি হয়।
লালশাক হলো ডাটাশাক বা অ্যামারান্থাস গণের পাতাপ্রধান ধরন; বাংলাপিডিয়ার মতে এই বীরুৎ উদ্ভিদের আদি নিবাস ভারতীয় বা ইন্দো-চীনা অঞ্চল। এর কচি পাতা ও ডাঁটায় ভিটামিন এ ও সি, ক্যালসিয়াম এবং আয়রন প্রচুর। পাতাপ্রধান ধরনটি সারা বছর চাষ করা যায়, তবে শীতের মাসগুলোতে ফলন সবচেয়ে বেশি হয়। এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ জাত আলতাপেটি এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত বারি লালশাক-১; জাতভেদে ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৫ টন পর্যন্ত হয়।
মুলা (Raphanus sativus) মূলত শীতের ফসল, তবে গ্রীষ্মেও কিছুটা চাষ করা যায়। এর পাতায় ভিটামিন এ, বি ও সি প্রচুর, আর শাঁসালো মূলে মাঝারি পরিমাণে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস থাকে। বাংলাপিডিয়া রেড বোম্বে, মিনো আর্লি ও মিনো সাকিকে গুরুত্বপূর্ণ জাত হিসেবে এবং বারির অবমুক্ত তিনটি জাত তাসাকিসান, পিংকি ও দ্রুতির নাম উল্লেখ করেছে, যেগুলোর ফলন হেক্টরপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ টন। বেগুন (Solanum melongena) অক্টোবর-নভেম্বরে লাগানো হয় এবং ৯০ থেকে ১০০ দিনে তোলার উপযোগী হয়; জাতভেদে হেক্টরপ্রতি ফলন ৪০ থেকে ৪৫ টন।
লাউ (Lagenaria siceraria) ও করলা বা উচ্ছে (Momordica charantia) কুমড়া পরিবারের (কিউকারবিটেসি) সদস্য, আর মরিচ বেগুনের মতোই সোলানেসি পরিবারের ক্যাপসিকাম গণের উদ্ভিদ। আমিরুল ইসলামের ফসলের তালিকা শুরু হয়েছিল লাউশাক দিয়ে, অর্থাৎ লাউগাছের কচি পাতা ও ডগা, যা শাক হিসেবে খাওয়া হয়।

দেশে ও উত্তরাঞ্চলে সবজি উৎপাদন
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জানায়, দেশে প্রায় ১ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয় এবং বছরে উৎপাদন প্রায় ১৭ মিলিয়ন টন। একই প্রতিবেদনে ২০২০-২১ অর্থবছরে সবজি উৎপাদন ১৪.৮২ মিলিয়ন টন দেখানো হয় এবং বলা হয়, দেশের ৮.৫ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমির ৭৫ শতাংশের বেশি জুড়ে আছে ধান ও অন্যান্য দানাশস্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনটি জানায়, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চীন ও ভারতের পরে তৃতীয়।
২০২৩ সালের এপ্রিলে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, গাইবান্ধাসহ ডিএইর রংপুর অঞ্চলে ২০২২-২৩ রবি মৌসুমে ৪০,৪৭০ হেক্টর জমি থেকে ৯,৬১,১৭০ টন শীতকালীন সবজি উৎপাদনের রেকর্ড লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, আর কৃষকেরা আবাদ করেছিলেন ৪০,৫৫৮ হেক্টরে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৯৮ হেক্টর বেশি। ততদিনে ৩৭,৪৮৫ হেক্টরের সবজি তোলা হয়ে গিয়েছিল, যাতে উৎপাদন হয় ৯,৪৩,১৩৭ টন, হেক্টরপ্রতি গড়ে ২৫.১৬ টন; ডিএই আশা করছিল, মৌসুম শেষে মোট উৎপাদন ১০.২৩ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। ডিএই রংপুরের উপপরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল পত্রিকাটিকে জানান, সেই মৌসুমে অধিদপ্তরের সহায়তায় কৃষকেরা মূল ভূমির জমি, নদীর চরাঞ্চল এবং পতিত বসতভিটাসহ আরও বেশি জমি সবজির আওতায় এনেছেন।
গোবিন্দগঞ্জের বিভাজক-বাগানের মৌসুম ২০২৫-২৬ সালের শীতে প্রতিবেশী রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ৮২,৫২৫ হেক্টর জমি থেকে ১৯.৭৫ লাখ টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে ডিএই; ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাসস এ খবর দেয়। এর মধ্যে বগুড়া কৃষি অঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২,৮৩০ হেক্টর থেকে ১০.১৩ লাখ টন, আর রাজশাহী অঞ্চলের ৩৯,৬৯৫ হেক্টর থেকে ৯.৬২ লাখ টন। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বগুড়া জেলা গাইবান্ধার দক্ষিণ সীমানায়।
মহাসড়কের জমি নিয়ে আইনে যা আছে
বাংলাদেশে মহাসড়ক ব্যবহারের নিয়ম ঠিক করে মহাসড়ক আইন, ২০২১ (২০২১ সনের ২৮ নং আইন, তারিখ ৭ ডিসেম্বর ২০২১)। বাংলা ট্রিবিউন সে সময় জানায়, ২০২১ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হয় এবং এটি ১৯২৫ সালের মহাসড়ক আইনের স্থলাভিষিক্ত হয়। আইনে ‘অধিদপ্তর’ অর্থ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, আর ‘মহাসড়ক’ বলতে শুধু সড়কটিই নয়, এর প্রান্তসীমার (রাইট অব ওয়ে) অন্তর্ভুক্ত ভূমি, ঢাল, কিনারা (বার্ম), নয়নজুলি, বরো-পিট, অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন মহাসড়ক-সংলগ্ন সকল ভূমি এবং সেই ভূমিতে থাকা গাছপালাও বোঝায়।
আইনের ৪ ধারায় অধিদপ্তরের কাজের তালিকায় আছে যানবাহন চলাচলের প্রকৌশলগত নিরাপত্তা, মহাসড়ক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পেভমেন্টের স্থায়িত্ব ও পানি নিষ্কাশনকে অগ্রাধিকার দিয়ে মহাসড়ক করিডোরে নান্দনিক বনায়ন এবং মহাসড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। ১৩ ধারা অনুযায়ী, মহাসড়ক এবং মহাসড়ক-সংশ্লিষ্ট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ও স্থাপনা অবৈধ দখল বা অবৈধ প্রবেশমুক্ত রাখার দায়িত্ব অধিদপ্তরের।
৯ ধারায় মহাসড়ক ব্যবহারের বিধি-নিষেধ দেওয়া আছে। এর মধ্যে রয়েছে: ফসল, খড় বা অন্য কোনো পণ্য শুকাতে মহাসড়ক ব্যবহার করা যাবে না; আইনের অধীনে অনুমোদিত উদ্দেশ্য ছাড়া মহাসড়কের কোনো স্থানে অবস্থান করা যাবে না; মহাসড়ক বিভাজকের কোনো ক্ষতি করা যাবে না; সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ রেখার মধ্যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ, হাট-বাজার বসানো বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে মহাসড়কের কোনো অংশ ব্যবহার করা যাবে না; এবং মহাসড়ক বা এর প্রান্তসীমায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা বা স্তূপ করা যাবে না। ১৪ ধারায় দণ্ড নির্ধারিত: মহাসড়কে ফসল শুকানো বা অনুমোদিত উদ্দেশ্য ছাড়া অবস্থানের জন্য ১,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা অর্থদণ্ড, আর অননুমোদিত ইউ-টার্ন নির্মাণ বা বিভাজকের ক্ষতির জন্য ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে এসব বিধান নিয়ে আলোচনা হয়নি, চাষাবাদে অধিদপ্তরের অনুমোদন ছিল কি না, তাও বলা হয়নি। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একমাত্র কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের ওই কর্মকর্তা উদ্যোগটিকে প্রশংসনীয় বলেছেন; সওজ, হাইওয়ে পুলিশ বা উপজেলা প্রশাসনের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে আসেনি।
যানবাহনের পাশে সবজি: গবেষণা যা বলে
সড়কের কাছে জন্মানো ফসলে যানবাহনের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশে গবেষণা হয়েছে। ২০১২ সালের মার্চে বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের হাবিব মোহাম্মদ নাসের, শারমিন সুলতানা, রেবেকা গোমেজ ও শামসুন নূর গাজীপুরের একটি প্রধান মহাসড়কের পাশের মাটি ও সবজিতে সিসা, ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের মাত্রা পরিমাপ করেন। সড়ক থেকে ০, ৫০, ১০০ ও ১,০০০ মিটার দূরত্বে মাটির নমুনা নেওয়া হয়, আর পরীক্ষা করা সবজি ছিল লাউ ও মিষ্টিকুমড়া।
বিজ্ঞানীরা দেখেন, মাটি ও সবজি দুটিতেই সিসা ও নিকেলের ঘনত্ব সড়ক থেকে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে কমেছে; তাঁদের মতে, এটি যানবাহন ও গাড়ির নির্গমনের সঙ্গে সম্পর্ক নির্দেশ করে। অন্যদিকে ক্যাডমিয়ামের ঘনত্ব দূরত্বের ওপর নির্ভরশীল পাওয়া যায়নি। প্রতিটি দূরত্বেই মাটি ও সবজিতে ভারী ধাতুর পরিমাণের ক্রম ছিল নিকেল, তারপর সিসা, তারপর ক্যাডমিয়াম। গবেষণাটি গাজীপুরের একটি মহাসড়ক নিয়ে, ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক নিয়ে নয়; আর গোবিন্দগঞ্জের বিভাজকে জন্মানো সবজির কোনো পরীক্ষার কথা জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সিসার বিষক্রিয়া নিয়ে তাদের তথ্যপত্রে (২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যেমন ছিল) জানায়, মানুষ মূলত সিসাযুক্ত বস্তু পোড়ানো থেকে তৈরি সিসার কণা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং দূষিত ধুলা, মাটি, পানি বা খাবার গিলে সিসার সংস্পর্শে আসে। সংস্থাটির মতে, সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই যা ক্ষতিকর নয়; ছোট শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে, একই পরিমাণ সিসা খেলে তারা বড়দের চেয়ে চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি শোষণ করতে পারে, আর সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের হিসাব উদ্ধৃত করে ডব্লিউএইচও জানায়, ২০২১ সালে বিশ্বে ১.৫ মিলিয়নের বেশি মৃত্যুর জন্য সিসার সংস্পর্শ দায়ী ছিল, প্রধানত হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর এর প্রভাবের কারণে।
ছবি: কামরুল ইসলাম শাহীন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বাংলাপিডিয়া (গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা; গাইবান্ধা জেলা; বরেন্দ্রভূমি; করতোয়া নদী; সবজি; শিম; ডাটাশাক; মুলা; বেগুন), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (২৬ মার্চ ২০২৪; ২ এপ্রিল ২০২৩; ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫), বাসস ও ফ্রেশপ্লাজা (২৮ নভেম্বর ২০২৫), দেশ রূপান্তর (২১ এপ্রিল ২০২৫), বাংলা ট্রিবিউন (২৭ নভেম্বর ২০২১), মহাসড়ক আইন, ২০২১ (বাংলাদেশের আইন, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ), বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ (নাসের ও অন্যান্য, ২০১২), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, উইকিপিডিয়া (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর; সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর)





মন্তব্য
(০)