২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, দেশের ইলিশ অভয়াশ্রমে টানা দুই মাসের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার শেষ দিনে, পদ্মা ও মেঘনায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন চাঁদপুরের জেলেরা। ইলিশের পোনা জাটকা সংরক্ষণে আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞা সেদিন বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে পদ্মা-মেঘনাসহ ছয়টি নদী অঞ্চলে প্রত্যাহার হওয়ার কথা ছিল বলে সেদিনই জানায় জাগো নিউজ ২৪। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার আগেই জেলেরা নৌকা মেরামত ও জাল সেলাইয়ের কাজ শেষ করেছিলেন। নতুন আশায় বুক বেঁধে তারা অপেক্ষা করছিলেন নদীর পুরোনো ব্যস্ততায় ফেরার।
ইলিশ সম্পদ রক্ষায় সরকারের জাটকা নিধন প্রতিরোধ কর্মসূচির আওতায় মার্চ ও এপ্রিল এই দুই মাস চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকাসহ ছয়টি নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। এ সময় মাছ ধরা, পরিবহন, বিক্রি ও মজুত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশনা ছিল।
জেলেদের অভিযোগ ও অভিযানের সরকারি হিসাব
তবে জেলেরা জাগো নিউজকে অভিযোগ করেন, ২০২৬ সালে জ্বালানি তেলের সংকটকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নদীতে তেমন জোরালো অভিযান চালায়নি। তাদের অভিযোগ, এর ফলে অনেক জেলে সুযোগ নিয়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই অবাধে জাটকাসহ বিভিন্ন মাছ ধরেছেন।
চাঁদপুর অঞ্চলের নৌপুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান পত্রিকাটিকে ভিন্ন চিত্র দেন। তিনি জানান, জাটকা রক্ষা অভিযানে প্রচুর জাল ও নৌকাসহ ৫ শতাধিক জেলেকে আটক করা হয়েছে এবং অভিযান অত্যন্ত সফল হয়েছে। তার ভাষ্য, শুধু বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে মাঝেমধ্যে অভিযান চালাতে সমস্যা হয়েছে, তবে এতে অভিযানে কোনো প্রভাব পড়েনি।
একই দিন সকালে প্রকাশিত ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রতিবেদনে জেলার জন্য মৎস্য বিভাগের হিসাব তুলে ধরা হয়: দুই মাসে চাঁদপুরে ৫ শতাধিক অভিযান ও ৫০টির বেশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় এবং ২ শতাধিক জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। চ্যানেলটির সঙ্গে কথা বলা জেলেরা অভিযানের চিত্র মাসভেদে আলাদা বলে বর্ণনা করেন; একজন বলেন, প্রথম এক মাস অভিযান ঢিলেঢালা ছিল, তবে শেষের এক মাস খুব কড়াকড়ি গেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা চ্যানেলটিকে বলেন, জেলেরাও বলছেন অন্যান্যবারের তুলনায় এবার বেশি অভিযান হয়েছে বলে তারা নদীতে নামতে পারেননি; তাই এই জাটকা থেকে ইলিশ হবে এবং উৎপাদন বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।
নিষেধাজ্ঞার প্রথম সপ্তাহগুলোর খবরে নদীতে অভিযানের চেহারা দেখা যায়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও দেশ রূপান্তর ৬ মার্চ জানায়, ৫ মার্চ বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত চাঁদপুর সদর উপজেলায় মেঘনা নদীর হরিনা থেকে কাচিকাটা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে টাস্কফোর্স ১৭ জেলেকে আটক করে এবং ২৫ হাজার মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও ইঞ্জিনচালিত তিনটি কাঠের নৌকা জব্দ করে। কোস্টগার্ডের চাঁদপুর স্টেশনে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পৃথক দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের ১৩ জনকে ৫ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেন; অপ্রাপ্তবয়স্ক চারজনকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। জাল আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়, নৌকাগুলো রাখা হয় কোস্টগার্ডের হেফাজতে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ১১ মার্চ জানায়, ১০ মার্চ মঙ্গলবার গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্টগার্ড হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী সংলগ্ন মেঘনায় একটি কাঠের বোট তল্লাশি করে প্রায় ৫ হাজার ১০০ কেজি বা ১২৭ মণ জাটকা পায়, কর্মকর্তারা যার বাজারমূল্য ধরেন ৩৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা। ভ্রাম্যমাণ আদালত বোটের ১০ জেলেকে দুই হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও প্রত্যেককে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন, আর জব্দ জাটকা স্থানীয় এতিমখানা ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

জেলে ও পুলিশের কথায় আসা জ্বালানি সংকট
দুই পক্ষই যে জ্বালানি সংকটের কথা বলেছেন, তা ছিল সেই বসন্তের বাস্তবতা। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ১ লাখ টন আমদানি করা জ্বালানি তেল খালাস হচ্ছিল: একটি জাহাজ থেকে ৩৩ হাজার ৩৯৮ টন ও আরেকটি থেকে ৩৫ হাজার ৩৪৫ টন ডিজেল খালাস হয় মেঘনা ডিপোতে, মালয়েশিয়া থেকে আসা আরেকটি জাহাজ থেকে খালাস শুরু হয় ২৭ হাজার টন অকটেন। একই দিন জ্বালানি বিভাগ জানায়, সৌদি আরব থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি ট্যাংকার বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে যেটির চট্টগ্রামের গভীর সমুদ্রে পৌঁছানোর কথা ছিল।
দেশ রূপান্তর ৩ এপ্রিল জানায়, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের মধ্যে কর্তৃপক্ষ ১৭ দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে তেলের অবৈধ মজুত ও পাচারের বিরুদ্ধে এবং ভুয়া চাহিদাপত্র দেখিয়ে পাম্প থেকে তেল নেওয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছিল। চাঁদপুরও এর বাইরে ছিল না। দৈনিক ইনকিলাব জানায়, ১ এপ্রিল মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত নায়েরগাঁও ও নারায়ণপুর বাজারে জ্বালানি তেলের সঠিক হিসাব দিতে না পারা, লাইসেন্স ও মূল্যতালিকা না থাকা এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির দায়ে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা ও একজনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। জব্দ করা ১১৫ লিটার ডিজেল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জেনারেটরের জন্য দেওয়া হয়।
জ্বালানির প্রশ্ন সরাসরি সরকারের কাছেও উঠেছিল। ৬ এপ্রিল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি তেলের অভাবে জেলেরা ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে যেতে পারছেন না, এ বিষয়ে সাংবাদিকরা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে তিনি বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমস্যা নেই এবং জরুরি খাতগুলোতে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, জানায় দেশ রূপান্তর।
ঋণের বোঝা ও দুই মাস বেকার থাকার খরচ
চাঁদপুর সদর উপজেলার হানারচর ইউনিয়নের হরিনাঘাট মেঘনা পাড়ের জেলে আল আমিন ছৈয়াল জাগো নিউজকে জানান, সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা তারা মেনে চলেছেন। কিন্তু এই দুই মাস সংসার চালাতে তাদের সুদে টাকা নিতে হয়েছে, আর এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিন কাটছে। সময়মতো ঋণ শোধ করতে না পারলে চরম বিপদে পড়ার আশঙ্কাও করছিলেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞা শুরুর সময়ই এই চাপের আভাস মিলেছিল। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২৮ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুর থেকে জানায়, অভয়াশ্রম এলাকার প্রায় ৪৭ হাজার নিবন্ধিত জেলে নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকবেন, তাদের মধ্যে ৩৯ হাজার ৪০০ জন ভিজিএফের চাল পাবেন, ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাস মাসে ৪০ কেজি করে। চাঁদপুর সদরের লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের মেঘনা উপকূলীয় জেলেপল্লি বহরিয়ার জেলেরা সংস্থাটিকে বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় তারা জাল ও নৌকা ডাঙায় তুলে রাখেন, কিন্তু খাদ্য সহায়তায় সংসার চালাতে কষ্ট হয়। তাদের কথায়, শুধু চাল দিয়ে সংসার চলে না; সন্তানদের পড়ালেখা ও ঋণের কিস্তির কারণে তাদের আর্থিক সহায়তাও দরকার।
ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ২৭ ফেব্রুয়ারি জানায়, নিষেধাজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন চাঁদপুর সদর, হাইমচর, মতলব দক্ষিণ ও মতলব উত্তর এই চার উপজেলার ৪৭ হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলে। চ্যানেলটির সঙ্গে কথা বলা জেলেরা বলেন, কিস্তির চাপ ও সংসারের দৈনন্দিন খরচের তুলনায় চাল যথেষ্ট নয়, এবং কিস্তি বন্ধে সরকারের কিছু করা উচিত। বড় স্টেশন মাছঘাটের এক ব্যবসায়ী মনে করিয়ে দেন, নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে রোজার মাসে, যখন সংসারের খরচ দ্বিগুণ আর সব জিনিসের দাম বেশি।
২০২৬ সালে কিছু জেলে প্রথমবারের মতো চালের বাইরে অন্য খাদ্যও পান। দেশ রূপান্তর জানায়, ৬ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে একটি জেলে পরিবারকে দুই মাসের জন্য ৮০ কেজি চাল, ১২ কেজি আটা, ১০ কেজি তেল, ৮ কেজি ডাল, ৪ কেজি চিনি ও ১৬ কেজি আলু দেওয়া হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৬ হাজার টাকা, এবং এই প্রথম ৪০ হাজার জেলেকে এই পরিমাণ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

জাটকা কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আজকের জাটকা আগামী দিনের বড় ইলিশ। নির্বিচারে এসব জাটকা বা ছোট ইলিশ ধরা হলে আগামীতে ইলিশ উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তার মতে, সেই বছর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জাটকা সংরক্ষণ করা গেলে দেশে পৌনে ৬ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ার সম্ভাবনা ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি নিষেধাজ্ঞা শুরুর দিন বাসসকেও তিনি একই কথা বলেছিলেন: জাটকা সংরক্ষণে সবাইকে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, কারণ আজকের জাটকা আগামী দিনের ইলিশ; জাটকা সংরক্ষণ হলে জেলেসহ দেশের সবাই এর সুফল পাবেন।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ইলিশ (Tenualosa ilisha) হেরিং গোত্রের একটি অভিপ্রয়াণী (অ্যানাড্রোমাস) মাছ: এরা উজানে মিঠাপানিতে ডিম ছাড়ে, ভাসমান ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়, পোনা নদীর খাতে বড় হয়, এরপর খাবার ও বৃদ্ধির জন্য সাগরে নেমে যায় এবং প্রজননক্ষম হয়ে আবার নদীতে ফেরে। একটি বড় স্ত্রী ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। ইলিশ কমবেশি সারা বছরই ডিম ছাড়ে, তবে ফেব্রুয়ারি-মার্চে একটি ছোট এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রধান প্রজনন মৌসুম। এদের প্রধান খাদ্য প্লাংকটন, যার মধ্যে আছে নীলাভ-সবুজ শৈবাল, ডায়াটম, কোপিপোড ও রটিফার।
একই ভুক্তিতে বলা হয়েছে, জাটকা হলো ইলিশের পোনার স্থানীয় নাম। অভিপ্রয়াণী স্ত্রী ইলিশ পদ্মা, যমুনা ও মেঘনাসহ বড় নদীগুলোর উজানে ডিম ছাড়ে। লার্ভা কিছুদিন নার্সারি এলাকায় খেয়ে বড় হয়, আর প্রায় ছয় থেকে দশ সপ্তাহে জাটকা হয়ে সাগরের দিকে নামতে শুরু করে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ১৯৯২-৯৪ সালের এক জরিপে হিসাব করা হয়েছিল, জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মৌসুমে প্রতিবছর জগৎবেড় জাল, কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালের মতো সরঞ্জামে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টন জাটকা ধরা পড়ে, যার অর্ধেকের বেশি মেঘনায়।
অভয়াশ্রমের বাইরেও জাটকা ধরা নিষিদ্ধ ছিল। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর জানায়, সেদিন থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আট মাসের দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে, যার আওতায় ২৫ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশ ধরা, পরিবহন, বাজারজাত, কেনাবেচা ও মজুত নিষিদ্ধ। পত্রিকাটির তথ্যমতে, মৎস্য সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৮৫ ও সংশোধিত মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীর দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে, আর মৎস্য অধিদপ্তর জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ, র্যাবসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে মিলে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করবে।

কমে যাওয়া স্রোত ও জেগে ওঠা ডুবোচর
আল আমিনের মতোই হতাশা প্রকাশ করেন লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের জেলে মো. আনোয়ার। তার মতে, সরকারের অভিযান থাকলেও বাস্তবে নদীতে মাছের সংখ্যা দিন দিন কমছে। নদীর স্রোত কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর জেগে ওঠা মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন তিনি।
মৎস্য কর্মকর্তারাও একই ধরনের বাধার কথা বলেছিলেন। প্রথম আলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জানায়, টানা তিন বছর ইলিশ ছোট হয়ে আসার জন্য মৎস্য অধিদপ্তর বৃষ্টি কমে যাওয়াকে দায়ী করছে; একই সঙ্গে সংস্থাটির বিজ্ঞানীরা বলছেন, বঙ্গোপসাগর থেকে মেঘনার মোহনা দিয়ে ইলিশের প্রবেশমুখগুলোতে ডুবোচরের সংখ্যা বাড়ছে। ইলিশ আসার পথ আটকে যাওয়ায় নদীতে আগের চেয়ে কম ইলিশ ধরা পড়ছে, বিশেষ করে বড় ইলিশ উপকূলের কাছাকাছি ও নদীতে আসা কমিয়ে দিয়েছে বলে তারা মনে করেন।
দেশ রূপান্তর জানায়, ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, নদীগুলোতে চর পড়ার কারণে ইলিশের উৎপাদন কমেছে; উৎপাদন বাড়াতে ওই জায়গাগুলো পরিষ্কার করতে হবে, যাতে ইলিশ ঠিকভাবে চলাচল করতে পারে, এবং এ জন্য নদী ও খাল খনন কর্মসূচি নেওয়া আছে। নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ ও মৎস্যসম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে ইলিশ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ ২০২৩-২৪, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়, দীর্ঘমেয়াদি চিত্রটি দেয়। এতে বলা হয়েছে, সত্তরের দশকে প্রচুর থাকা ইলিশ নব্বইয়ের দশকে অনেক নদী ব্যবস্থায় ক্রমে কমে যায়; নদীতে আহরণ কমার পেছনে একাধিক কারণ: অভিপ্রয়াণের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, নদীতে পলি জমা, অতিরিক্ত আহরণ, মনোফিলামেন্টের ছোট ফাঁসের জাল (কারেন্ট জাল) দিয়ে নির্বিচারে মা মাছ ও পোনা ধরা, মাছ ধরায় যান্ত্রিকীকরণ, জেলের সংখ্যা বৃদ্ধি, শিল্পদূষণ ও জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা। বাংলাপিডিয়া এর সঙ্গে যোগ করেছে ফারাক্কা বাঁধের পর গঙ্গায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, ডিম ছাড়া, খাবার ও নার্সারি এলাকা হারানো এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের প্রভাব; জাটকার নার্সারি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত করা প্রকল্পগুলোর মধ্যে চাঁদপুর সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের নামও সেখানে আছে।
ছয় অভয়াশ্রম ও মার্চ-এপ্রিলের নিষেধাজ্ঞা
জেলা মৎস্য বিভাগ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাসসকে জানায়, চাঁদপুরের অভয়াশ্রম মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার নদী এলাকাজুড়ে। এটি ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনার ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অভয়াশ্রমের চাঁদপুর অংশ।
ডায়ালগ আর্থ ২০১৮ সালে জানায়, ২০০২-০৩ সালে ইলিশের উৎপাদন ১ লাখ ৯৯ হাজার টনে নেমে যাওয়ার পর ২০০৪ সালে জাটকা সংরক্ষণে একটি প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ। ২০০৭-০৮ মৌসুম থেকে উপকূলীয় নদীর বিভিন্ন অংশকে ইলিশ অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয় এবং নভেম্বর থেকে জুন আট মাস জাটকা ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ২০১৮ সালের জুনে বরিশাল জেলার হিজলা থেকে মেহেন্দিগঞ্জ পর্যন্ত মেঘনার অংশকে ষষ্ঠ অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়। ছয়টি অভয়াশ্রম হলো:
- ষাটনল থেকে চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনার ১০০ কিলোমিটার;
- ভোলা জেলায় মেঘনার মোহনায় শাহবাজপুর চ্যানেলের ৯০ কিলোমিটার;
- ভোলা জেলায় তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার;
- পটুয়াখালী জেলায় আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার;
- শরীয়তপুর জেলায় নিম্ন পদ্মার মোহনার ২০ কিলোমিটার;
- বরিশাল জেলায় হিজলা থেকে মেহেন্দিগঞ্জ পর্যন্ত মেঘনার ৮৩ কিলোমিটার।
ঢাকা ট্রিবিউনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আন্ধারমানিক ছাড়া সব অভয়াশ্রমে মার্চ ও এপ্রিলে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ; আন্ধারমানিকে নিষেধাজ্ঞা চলে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি। মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৩-২৪ সালের ইয়ারবুকে ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রমের পাশাপাশি আরও প্রায় ৫০৮টি মৎস্য অভয়াশ্রমের কথা আছে, এবং ইলিশ ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনার উপায় হিসেবে ইলিশ অভয়াশ্রম, মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা ও দরিদ্র জেলেদের চাল বিতরণের কথা বলা হয়েছে।
২০২৬ সালে নিষেধাজ্ঞা শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার দিবাগত রাত ১২টার পর, চলার কথা ছিল ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন জানায়, অভয়াশ্রম এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টহলে থাকবে জেলা প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড। চাঁদপুরে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, ১২টি স্পিডবোটে টাস্কফোর্স দিনরাত টহল দেবে, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান সার্বক্ষণিক চলবে, আর সচেতনতা সভা, মাইকিং ও পোস্টারিংয়ের মাধ্যমে জেলেদের আগেই সতর্ক করা হয়েছে; মাঠপর্যায়ে নৌবাহিনীরও থাকার কথা ছিল। পাশের জেলাগুলোর মধ্যে শরীয়তপুরে ১৫ হাজার ৬৫০ জন তালিকাভুক্ত জেলে চাল পাচ্ছিলেন, তাদের মধ্যে অভয়াশ্রমের ২০ কিলোমিটার এলাকার ২ হাজার জেলে বাড়তি পাবেন ডাল, তেল, লবণ, পেঁয়াজ ও আলুর প্যাকেজ; ভোলায় ১৯০ কিলোমিটার এলাকার দুটি অভয়াশ্রমে মাছ ধরা বন্ধ হয়; আর লক্ষ্মীপুরে এপ্রিল পর্যন্ত ইলিশ সংরক্ষণ ও মজুত নিষিদ্ধ করা হয় এবং বরফকলগুলো বন্ধ রাখা হয়।
জাতীয় হিসাবে ইলিশ
নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছিল উৎপাদন কমে যাওয়ার এক সময়ে। দেশ রূপান্তর জানায়, ৬ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য তুলে ধরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ টনে নেমেছে, যা গত আট বছরে সর্বনিম্ন। পত্রিকাটি অধিদপ্তরের ধারাবাহিক হিসাবও দেয়: ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন, ২০১৮-১৯ সালে ৫ লাখ ৩২ হাজার, ২০১৯-২০ সালে ৫ লাখ ৫০ হাজার, ২০২০-২১ সালে ৫ লাখ ৬৫ হাজার, ২০২১-২২ সালে ৫ লাখ ৬৬ হাজার, ২০২২-২৩ সালে ৫ লাখ ৭১ হাজার এবং ২০২৩-২৪ সালে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন। এর আগে উৎপাদন ৫ লাখ টনের নিচে ছিল ২০১৬-১৭ অর্থবছরে, ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন।
একই সংবাদ সম্মেলনের তথ্যমতে, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ; বিশ্বের মোট ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হয় বাংলাদেশের নদ-নদী, মোহনা ও সাগর থেকে; ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে; আর বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। প্রায় ৬ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে যুক্ত, আর ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ পরিবহন, বিক্রি, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর ওপর নির্ভরশীল।
মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৩-২৪ সালের ইয়ারবুকে সারা দেশে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টন, মোট মৎস্য উৎপাদনের ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। চাঁদপুরে সে বছর ইলিশ আহরিত হয় ৩২ হাজার ৩০৪ টন, পুরোটাই নদী থেকে: নিম্ন মেঘনা থেকে ৩১ হাজার ৫৬০ টন এবং অন্যান্য নদী থেকে ৭৪৪ টন। সে বছর জেলার মোট মৎস্য উৎপাদন ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৬৫ টন, তার মধ্যে নদী থেকে ৪০ হাজার ৭৪৮ টন।
নিষেধাজ্ঞার মাঝপথে চাঁদপুরেই হয় জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬-এর জাতীয় উদ্বোধন। বাসস জানায়, ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল দেশের ইলিশসমৃদ্ধ ২০টি জেলায় এই সপ্তাহ পালিত হয়, আর ৭ এপ্রিল চাঁদপুর জেলা সদরের মোলহেডে এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল "জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী"। অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে মেনে চলার মাধ্যমে জাটকা নিধন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে মৎস্যজীবী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সবাইকে জাটকা সংরক্ষণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

নদীর মোহনায় চাঁদপুর
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগের চাঁদপুর জেলার আয়তন ১ হাজার ৬৪৫ দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে মুন্সীগঞ্জ ও কুমিল্লা জেলা, দক্ষিণে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও বরিশাল জেলা, পূর্বে কুমিল্লা জেলা এবং পশ্চিমে মেঘনা নদী, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জ জেলা। জেলার প্রধান নদী মেঘনা, ডাকাতিয়া, গোমতী ও ধনাগোদা। চাঁদপুর মহকুমা হয় ১৮৭৮ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা গণনা করা হয় ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৭৪৮ জন।
বাংলাদেশে গঙ্গার প্রধান শাখা পদ্মা চাঁদপুর জেলায় এসে মেঘনায় মেশে; এর ওপরের অংশ ঊর্ধ্ব মেঘনা আর নিচের অংশ নিম্ন মেঘনা নামে পরিচিত, যা মিলিত প্রবাহ নিয়ে প্রায় সোজা বঙ্গোপসাগরের দিকে নেমে যায়। চাঁদপুর সদরের বড় স্টেশনের মোলহেডে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া এই তিন নদী মিলেছে।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জেলেদের এলাকা চাঁদপুর সদর উপজেলার আয়তন ৩০৮ দশমিক ৭৭ বর্গকিলোমিটার; এর প্রধান নদী নিম্ন মেঘনা ও ডাকাতিয়া, আর বাংলাপিডিয়া উপজেলার প্রধান রপ্তানিপণ্যের তালিকায় প্রথমেই রেখেছে ইলিশ। হানারচর এই উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদ। এই উপজেলাতেই বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্র; প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে, কাজ শুরু করে ১৯৮৬ সালে, আর এর সদর দপ্তর ময়মনসিংহে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও নদীতে মাছ ধরা তদারক করা বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিট নৌপুলিশ প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের ১২ নভেম্বর।
ছবি: AsikBinRahim / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দেশ রূপান্তর, দৈনিক ইনকিলাব, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, ডায়ালগ আর্থ, মৎস্য অধিদপ্তর (ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ ২০২৩-২৪), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)