২০১৭ সালের অক্টোবরে বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪ একই পুকুরে অন্য প্রজাতির মাছের সঙ্গে থাই পাঙ্গাস (স্ট্রাইপড ক্যাটফিশ, বৈজ্ঞানিক নাম Pangasianodon hypophthalmus) চাষের একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে। নির্দেশিকায় বলা হয়, বাংলাদেশের পুকুর ও জলাশয় পাঙ্গাস চাষের জন্য খুবই উপযোগী, আর পাঙ্গাসের সঙ্গে তেলাপিয়া, কৈ, গলদা চিংড়ি, শিং ও মাগুর লাভজনকভাবে চাষ করা যায়। এতে স্থান নির্বাচন, পুকুর প্রস্তুতি, পোনা, খাদ্য, পরিচর্যা ও বিক্রির কথা ছিল। এই প্রতিবেদনে সেই নির্দেশিকা তুলে ধরা হয়েছে এবং তার পরামর্শ মিলিয়ে দেখা হয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং ওয়ার্ল্ডফিশের সেই সময় পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে।
২০১৭ সাল নাগাদ পাঙ্গাস দেশের প্রধান চাষের মাছগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল। ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত মৎস্য অধিদপ্তরের 'ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ ২০১৫-১৬' অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে পাঙ্গাস উৎপাদিত হয় ৫ লাখ ৪ হাজার ৬৭৪ টন, যা মোট ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৪ টন মাছ উৎপাদনের ১৩.০১ শতাংশ। এর প্রায় সবটাই, ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৩৫৭ টন, এসেছিল পুকুর থেকে।
২০১৭ সালের নির্দেশিকায় যা বলা হয়েছিল
স্থান নির্বাচন নিয়ে নির্দেশিকায় বলা হয়, পাঙ্গাস পুকুরে চাষের জন্য খুবই উপযোগী এবং যেসব পুকুর বা জলাশয়ে পাঁচ-ছয় মাস পানি থাকে সেখানে সহজেই এ মাছ চাষ করা যায়। তবে এমন পুকুর বেছে নিতে হবে যা সহজে শুকানো যায়, প্রয়োজনমতো পানি সরবরাহের ব্যবস্থা আছে, উৎপাদিত মাছ ও খাদ্য উপকরণ সহজে পুকুরপাড়ে আনা-নেওয়া করা যায় এবং সর্বোপরি যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পড়ে।
প্রজাতির সমন্বয় নিয়ে নির্দেশিকায় বলা হয়, বাংলাদেশে সুষম দানাদার খাবার দিয়ে পাঙ্গাসের সঙ্গে তেলাপিয়া, কৈ, গলদা চিংড়ি, শিং ও মাগুর চাষ করলে এক বছরে একরপ্রতি ৮ থেকে ১০ টন মাছ উৎপাদন সম্ভব। পরিচিত মৎস্য খামার থেকে ভালো মানের পাঙ্গাস, তেলাপিয়া ও শিংয়ের পোনা সংগ্রহ করতে হবে, সঙ্গে কার্পজাতীয় মাছের পোনাও ছাড়তে হবে। নির্দেশিকায় জোর দিয়ে বলা হয়, চাষের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে ভালো মানের ও উপযুক্ত আকারের পোনার ওপর।
পুকুর প্রস্তুতি নিয়ে বলা হয়, পুকুর ভালোভাবে শুকিয়ে শতকে ১ কেজি হারে চুন দিতে হবে, তলায় কাদা থাকলে চুন কাদার সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে এবং চুন দেওয়ার চার-পাঁচ দিন পর পানি দিতে হবে। মৎস্য অধিদপ্তরের মনোসেক্স তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস চাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ মডিউলে পুকুর প্রস্তুতির সময় শতাংশে ১ থেকে ২ কেজি চুনের কথা বলা আছে, ফলে নির্দেশিকার মাত্রাটি সরকারি মাত্রার নিচের সীমায় পড়ে।
খাদ্য ও পরিচর্যা নিয়ে নির্দেশিকায় বলা হয়, মাছ যতটুকু খেতে পারে প্রতিদিন ঠিক ততটুকু খাবার দিতে হবে এবং আমিষজাতীয় খাবারের ব্যবস্থা রাখতে হবে; যে পুকুরে নিয়মিত পানি বদলানো হয় সেখানে মাছ বেশি খায়, তাই খাবারও বেশি দিতে হয়। অবস্থা বুঝে আংশিক পানি বদলাতে হবে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার কোনোভাবেই দেওয়া যাবে না, অক্সিজেনের অভাব হলে পুকুরে পানি দিতে হবে এবং পানি বেশি সবুজ হলে খাবার কমাতে হবে। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়, বেশি ঘনত্বে মাছ থাকলে খাবার দেওয়ার সময় মাছ পানির ওপরের স্তরে চলে আসে এবং শিকারি পাখি তা ধরে নিতে পারে, তাই পুকুরের ওপর জাল দেওয়া যেতে পারে।
বিক্রি নিয়ে নির্দেশিকায় বলা হয়, মজুদের সাত-আট মাস পর পাঙ্গাসের গড় ওজন প্রায় ১,০০০ থেকে ১,১০০ গ্রাম হয় এবং তখন পাঙ্গাসসহ পুকুরের অন্য মাছও বাজারে বিক্রির উপযোগী হয়।
থাই পাঙ্গাস যেভাবে বাংলাদেশে এল
এ মাছ বাংলাদেশের নিজস্ব নয়। এফএওর প্রজাতি তথ্যপত্র অনুযায়ী, স্ট্রাইপড ক্যাটফিশের আদি নিবাস কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মেকং ও চাও ফ্রায়া নদী অববাহিকা, আর জলজ চাষের জন্য যেসব এশীয় দেশে এটি নেওয়া হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ আছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ২০০৯ সালের জুনের প্রশিক্ষণ মডিউলে বলা হয়, থাই পাঙ্গাস প্রথম ১৯৯০ সালে বেসরকারি উদ্যোগে থাইল্যান্ড থেকে আনা হয়। এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পিটার এডওয়ার্ডস ও ওয়ার্ল্ডফিশের মনজুরুল করিম ২০০৭ সালে গ্লোবাল অ্যাকোয়াকালচার অ্যাডভোকেট সাময়িকীতে লেখেন, থাই পাঙ্গাস আসে ১৯৯০ সালে এবং দেশি পাঙ্গাসের প্রজননের চেষ্টা সফল না হওয়ায় সরকার থাই পাঙ্গাস আমদানি করে; একই সাময়িকীর ২০১২ সালের এক নিবন্ধে প্রবর্তনের বছর লেখা হয়েছে ১৯৮৯।
দেশে প্রজনন শুরু হওয়াই ছিল মোড় ঘোরানো ঘটনা। এফএওর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিএফআরআইয়ের এক উপস্থাপনায় বলা হয়, ইনস্টিটিউটটি ১৯৯৩ সালে প্রথম থাই পাঙ্গাসের প্রজনন প্রযুক্তি ও ব্যাপক হারে পোনা উৎপাদনের কৌশল উদ্ভাবন করে; মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউলেও বলা হয়েছে, সে বছর বিএফআরআইয়ের পোনা উৎপাদনের সাফল্যের পর থেকে এর চাষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ওয়ার্ল্ডফিশের ২০১১ সালের এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক চাষের সূচনা হিসেবে সাধারণত ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার আল ফালাহ নামের একটি খামারের কথা বলা হয়, যেখানে ১৯৯৩ সালে চাষ শুরু হয়; আর প্রথম বেসরকারি পাঙ্গাস হ্যাচারি গড়ে ওঠে ১৯৯৫ সালে বগুড়ার আদমদীঘিতে। বিএফআরআই ২০০৪ সালে দেশি পাঙ্গাসের (Pangasius pangasius) আবদ্ধ অবস্থায় প্রজননে সফল হয় এবং ব্রুড মাছের মান উন্নয়নে ২০১০ সালের অক্টোবরে থাইল্যান্ড ও ২০১১ সালের অক্টোবরে ভিয়েতনাম থেকে মেকংয়ের মাছের নতুন বন্য মজুদ সংগ্রহ করে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউলে দুই মাছের বর্ণনা আলাদা করে দেওয়া আছে। দেশি পাঙ্গাস পাওয়া যায় চট্টগ্রাম ও খুলনার উপকূলীয় এলাকায় এবং পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে, সাধারণত গভীর পানিতে; এটি রুপালি রঙের, পিঠের দিক কালচে, আর লম্বায় ১৫০ সেন্টিমিটার ও ওজনে ৩০ কেজি পর্যন্ত হয়। থাই পাঙ্গাস রুপালি-সাদা, পিঠ নীলাভ-কালো, আর মাথা থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত নীলাভ-কালচে লম্বা দাগ থাকে; এর ছোট গোঁফ ও পিঠে অ্যাডিপোজ পাখনা আছে।
মাছটির বৈশিষ্ট্য এবং চাষিরা কেন ঝুঁকলেন
এফএওর বর্ণনায় স্ট্রাইপড ক্যাটফিশ সর্বভুক মাছ: শৈবাল, উদ্ভিদ, প্রাণিকণা ও পোকামাকড় খায়, বড় মাছ ফল, কাঁকড়া-চিংড়িজাতীয় প্রাণী ও মাছও খায়। প্রকৃতিতে এটি ১৩০ সেন্টিমিটার ও ৪৪ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। প্রয়োজনে বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে বলে এটি প্রতি লিটারে ০.০৫ থেকে ০.১০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত কম দ্রবীভূত অক্সিজেনও সহ্য করে, আর এ কারণেই কার্পের চেয়ে অনেক বেশি ঘনত্বে চাষ করা যায়। আবদ্ধ অবস্থায় স্ত্রী মাছ প্রজননক্ষম হতে অন্তত তিন বছর লাগে এবং ১০ কেজির একটি স্ত্রী মাছ ১০ লাখের বেশি ডিম দিতে পারে। মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউলে যোগ করা হয়েছে, বদ্ধ জলাশয়ে এ মাছ ডিম দেয় না, তাই সব পোনাই আসে হ্যাচারি থেকে, আর চাষের পুকুরে এরা পানির প্রায় সব স্তরে বিচরণ করে।
একই মডিউলে পাঙ্গাস চাষের সুবিধাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। মাছটি রাক্ষুসে নয়, তাই অন্য প্রজাতির সঙ্গে চাষ করা যায়; সর্বভুক বলে যেকোনো সম্পূরক খাবারে চাষ করা যায়; দ্রুত বাড়ে, বেশি ঘনত্বে চাষযোগ্য এবং বাঁচার হারও বেশি; মৃদু লবণাক্ততা, অল্প অক্সিজেন এবং পিএইচ ও ঘোলাত্বের তারতম্য সইতে পারে; রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক বেশি; বাজারে চাহিদা ব্যাপক এবং বিদেশেও রপ্তানিযোগ্য। মডিউলে অসুবিধাগুলোও আছে: বাজারদর তুলনামূলক অনেক কম, সময়মতো পোনা পাওয়া যায় না, অন্তঃপ্রজননের কারণে মাছ ঠিকমতো বাড়ে না, নানা রোগবালাই দেখা দেয়, খাবারের দাম বেশি, নিবিড় চাষে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে, নিচু জমিতে বাণিজ্যিক পুকুরের কারণে পাশের উঁচু জমিতে জলাবদ্ধতা হয়, কোথাও কোথাও পানি দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায় এবং তখনকার বাজারজাতকরণ পদ্ধতিতে ক্ষুদ্র চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
পানির পরিবেশ ঠিক রাখতে মডিউলে পাঙ্গাসের একক চাষ না করে ৫ থেকে ৭ শতাংশ কার্পজাতীয় মাছ মজুদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এক-দুই বছর পরপর দূষিত তলদেশের মাটির একটি স্তর তুলে ফসলের জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার, পাশের ফসলি জমির ক্ষতি না করে পরিকল্পিতভাবে খামার করা, ভালো পোনা বেছে নেওয়া এবং ব্রুড মাছ নির্বাচনে হ্যাচারি মালিকদের সততার সঙ্গে কাজ করার কথাও বলা হয়েছে।

২০১৫-১৬ সালের মৎস্য পরিসংখ্যানে পাঙ্গাস
২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত মৎস্য অধিদপ্তরের ইয়ারবুক দেখায়, পুকুরে মাছ চাষ কতটা বড় হয়ে উঠেছিল। ২০১৫-১৬ সালে উৎপাদিত ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৪ টন মাছের ৫৬.৮২ শতাংশ এসেছে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ের চাষ থেকে। শুধু পুকুর, যার আয়তন ৩ লাখ ৭২ হাজার ৪০৫ হেক্টর, থেকেই এসেছে ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৭৮৩ টন, যা জাতীয় উৎপাদনের ৪৪.৩৪ শতাংশ; হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ৪ হাজার ৬১৮ কেজি।
পুকুরের এই উৎপাদনের মধ্যে একক দল হিসেবে পাঙ্গাসই ছিল সবচেয়ে বড়, ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৩৫৭ টন, যা পুকুরে উৎপাদিত সব মাছের ২৮.৭৫ শতাংশ। এরপর তেলাপিয়া ৩ লাখ ১৫ হাজার ৮৫১ টন (১৮.৩৭ শতাংশ) এবং রুই ২ লাখ ১০ হাজার ৪৭৩ টন (১২.২৪ শতাংশ)। ২০১৭ সালের নির্দেশিকায় উল্লিখিত অন্য মাছের মধ্যে কৈ উৎপাদিত হয় ৫৫ হাজার ১৬৩ টন (৩.২১ শতাংশ), আর শিং ও মাগুর মিলিয়ে ১২ হাজার ৭৬১ টন (০.৭৪ শতাংশ)।
ইয়ারবুকে দেশের ২১ লাখ ৬৭ হাজার ১০৩টি পুকুরকে চাষের নিবিড়তা অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে। হেক্টরে ১০ টনের বেশি উৎপাদনের 'অতি নিবিড়' শ্রেণির ১৪ হাজার ৫৩৮ হেক্টর পুকুরে উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৫৪৩ টন, হেক্টরপ্রতি গড়ে ২৪.৩১৯ টন; আর ২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৬ হেক্টর আধা-নিবিড় পুকুরে উৎপাদন হয়েছে ৭ লাখ ৮০ হাজার ৯৫৮ টন।
এ ক্ষেত্রে ময়মনসিংহ আলাদা করে চোখে পড়ে। ২০১৫-১৬ সালে জেলার ২৯ হাজার ৩৭১ হেক্টর পুকুরে উৎপাদন হয় ৩ লাখ ১৮ হাজার ৩৮৫ টন মাছ, হেক্টরপ্রতি গড়ে ১০.৮৪০ টন, আর এর মধ্যে পাঙ্গাস ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৭১ টন, অর্থাৎ জেলার পুকুর উৎপাদনের ৫৩.৮৯ শতাংশ। ওয়ার্ল্ডফিশের ২০১১ সালের পর্যালোচনায় স্থানীয় একাধিক সূত্রের বরাতে মুক্তাগাছায় প্রায় ২,৪৮০টি, ত্রিশালে ১,৭২০টি এবং ভালুকায় ১,৩০০টি পাঙ্গাস খামারের হিসাব দেওয়া হয়, পাশাপাশি নরসিংদী, নওগাঁ ও বগুড়ায় পাঙ্গাস খামারের গুচ্ছের কথাও বলা হয়।
পাঙ্গাসের সরকারি হিসাব সব সময় পূর্ণাঙ্গ ছিল না। একই পর্যালোচনায় বলা হয়, মৎস্য অধিদপ্তর ২০০৯ সালের জন্য মাত্র ৫৯ হাজার ৪৭৪ টন পাঙ্গাস উৎপাদন লিপিবদ্ধ করেছিল, অথচ অন্য গবেষণায় ২০০৮ সালে উৎপাদন প্রায় ৩ লাখ টন ধরা হয়েছিল, যা ২০০৯ সালে অতি-উৎপাদনে খামার পর্যায়ে দাম পড়ে যাওয়ায় এবং কিছু চাষি সাময়িকভাবে মজুদ বন্ধ রাখায় ২ লাখ থেকে আড়াই লাখ টনে নেমে আসে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউলে পুকুর প্রস্তুতি
মৎস্য অধিদপ্তর ও ড্যানিডার 'স্ট্রেংদেনিং ইনস্টিটিউশনাল ক্যাপাসিটি অব ডিওএফ' প্রকল্পের আওতায় ২০০৯ সালের জুনে প্রকাশিত প্রশিক্ষণ মডিউলে পাঙ্গাস মজুদ পুকুরের বৈশিষ্ট্য এভাবে দেওয়া আছে:
- পুকুর আয়তাকার ও মাঝারি আকারের, আয়তন ২৫ থেকে ১০০ শতাংশ;
- গভীরতা ১.৫ থেকে ২.০ মিটার, পাড়ের ঢাল ১:১.৫ থেকে ১:২ অনুপাতে, তলা সমান;
- মাটি দোআঁশ, এঁটেল দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ, তলায় কাদা ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটারের বেশি নয়;
- দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টা সূর্যের আলো, পাড়ে ছায়া সৃষ্টিকারী গাছ বা ঝোপঝাড় নেই;
- পাড় বাইরের পানি ঠেকানোর মতো উঁচু ও শক্ত, যোগাযোগব্যবস্থা ভালো এবং সম্ভব হলে পুকুর বাড়ির কাছাকাছি।
মডিউল অনুযায়ী, মজুদের আগে ভাঙা পাড় ও ঢাল মেরামত করতে হবে যাতে বাইরের রাক্ষুসে ও অবাঞ্ছিত মাছ ঢুকতে না পারে; তলার ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটারের বেশি কালো ও পচা কাদা তুলে ফেলতে হবে, কারণ এতে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয় ও অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়; পানিতে ছায়া ফেলা বড় গাছের ডালপালা কাটতে হবে এবং পাড়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে হবে যাতে মাছখেকো প্রাণী লুকিয়ে থাকতে না পারে। জলজ আগাছা পুষ্টি টেনে নেয়, সূর্যের আলো আটকায় ও জাল টানায় অসুবিধা করে; এগুলো হাতে তুলে, জৈবিক উপায়ে, সার প্রয়োগে বা রাসায়নিক পদ্ধতিতে দমন করা যায়।
বোয়াল, গজার, শোল, চিতল, ফলি, কাকিলা ও টাকির মতো রাক্ষুসে মাছ সরাতে হবে; মডিউলের হিসাবে একটি রাক্ষুসে মাছ ১ কেজি বড় হতে প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজি অন্য মাছ খায়। এ জন্য পুকুর শুকানোই সবচেয়ে ভালো উপায়। পুকুর শুকানো না গেলে মডিউলে কয়েকটি মাছ মারার বিষের কথা আছে, তবে সেগুলোর ব্যবহার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়েই করা উচিত।
চুন দিতে হবে শতাংশে ১ থেকে ২ কেজি। মডিউলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, চুন মাটি ও পানির পিএইচ মাছ চাষের উপযোগী মাত্রায় রাখে, পানির ক্ষারত্ব প্রতি লিটারে ২০ মিলিগ্রামের বেশি রাখতে সাহায্য করে, সারের কার্যকারিতা বাড়ায়, পুকুর প্রস্তুতির সময় পরজীবী ও রোগজীবাণু দূর করে, কাদায় আটকে থাকা ফসফরাস মুক্ত করে এবং পানির ঘোলাত্ব দূর করে।
এরপর পোনার প্রাকৃতিক খাবার প্লাঙ্কটন তৈরির জন্য প্রস্তুতকালীন সার দেওয়া হয়। মডিউলে শতাংশপ্রতি মাত্রা দেওয়া আছে: গোবর ৫ থেকে ৭ কেজি, অথবা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ৩ থেকে ৫ কেজি, অথবা কম্পোস্ট ৮ থেকে ১০ কেজি; সঙ্গে ইউরিয়া ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম ও টিএসপি ৭৫ থেকে ১০০ গ্রাম। সার দিতে হবে চুন দেওয়ার পাঁচ থেকে সাত দিন পর এবং পোনা মজুদের আট থেকে দশ দিন আগে, রোদেলা দিনে সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে। মডিউলে আরও বলা হয়েছে, পাঙ্গাসের আধা-নিবিড় ও নিবিড় চাষে এরপর আর সার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মজুদের আগে পুকুরে একটি হাপা টাঙিয়ে অল্প কিছু পোনা ১২ ঘণ্টা রেখে দেখতে হবে; অধিকাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ পোনা বেঁচে থাকলে বুঝতে হবে পানিতে বিষাক্ততা নেই।
মিশ্র পুকুরে পোনা মজুদ
মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউলে একক চাষে শুধু পাঙ্গাস এবং বাড়তি আয়ের জন্য এর সঙ্গে মাগুর ও কাতলা, আর মিশ্র চাষে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, মাগুর, শিং, রুই ও কাতলার পোনা বেছে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মজুদ ঘনত্ব নির্ভর করে ব্যবস্থাপনার ধরনের ওপর। শুধু পাঙ্গাসের একক চাষে শতাংশপ্রতি সনাতন পদ্ধতিতে ৭৫ থেকে ১০০টি, উন্নত সনাতন পদ্ধতিতে ২০০ থেকে ২১০টি, আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে ২০০ থেকে ৩০০টি এবং নিবিড় পদ্ধতিতে ৩০০ থেকে ৭০০টি পোনার কথা বলা আছে। পাঙ্গাস ও তেলাপিয়ার মিশ্র চাষে একই চার স্তরে দুই প্রজাতির প্রতিটির জন্য শতাংশে যথাক্রমে ৪০ থেকে ৫০টি, ৫০ থেকে ১০০টি, ১০০ থেকে ১৫০টি এবং ১৫০ থেকে ৩৫০টি পোনা।
ততদিনে পোনা সহজলভ্য হয়ে উঠেছিল। মডিউলে পোনার উৎস হিসেবে ময়মনসিংহের বিএফআরআই ও বগুড়ার আদমদীঘির নাম আছে। ওয়ার্ল্ডফিশের ২০১১ সালের পর্যালোচনায় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান থেকে নিবন্ধিত ৮০২টি হ্যাচারির মধ্যে ১৪ জেলার ১৭৪টি হ্যাচারিতে পাঙ্গাসের পোনা উৎপাদনের হিসাব দেওয়া হয় এবং বলা হয়, বগুড়াকে সাধারণত দেশের সেরা পাঙ্গাস পোনার এলাকা ধরা হয়; ময়মনসিংহের অনেক নার্সারি ও খামার আদমদীঘির পোনা ব্যবহার করে।
পোনার মান যাচাইয়ের উপায়ও মডিউলে আছে। ভালো পোনা দ্রুত সাঁতরায়, রং কালচে বাদামি, পাত্রে হাত দিলে দ্রুত দূরে সরে যায় এবং পাত্রের গায়ে হঠাৎ টোকা দিলে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেয়; খারাপ পোনা ধীরগতির, ফ্যাকাশে বা সাদাটে এবং দেরিতে সাড়া দেয়।
পরিবহনের আগে অন্তত দুই ঘণ্টা খাবার বন্ধ রাখতে হবে, কারণ পেটে খাবার থাকলে পোনা বমি ও মলমূত্র ত্যাগ করে পানি দূষিত করে। পলিথিন ব্যাগে ছিদ্র আছে কি না দেখে নিয়ে একটির ভেতরে আরেকটি ব্যাগ দিয়ে, এক-চতুর্থাংশ পানি ও বাকি অংশে অক্সিজেন ভরে পোনা নিতে হবে, ব্যাগে যেন চাপ না লাগে এবং পাত্র ভেজা কাপড় বা চট দিয়ে ঢাকা থাকে। পুকুরে পৌঁছে ব্যাগ ১৫ থেকে ২০ মিনিট পানিতে ভাসিয়ে রাখতে হবে, যাতে ব্যাগের পানি ও পুকুরের পানির তাপমাত্রার পার্থক্য ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না থাকে। এরপর ব্যাগের মুখ কাত করে পুকুরের পানি ভেতরে ঢুকতে দিলে সুস্থ-সবল পোনা নিজেরাই বেরিয়ে যায়। পোনা ছাড়তে হবে সকালে বা বিকেলে; মেঘলা বা ভ্যাপসা দিনে দুপুরে পোনা ছাড়া উচিত নয়।
নির্দেশিকায় পাঙ্গাসের সঙ্গে যেসব মাছের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো এ ধরনের চাষেরই অংশ। ওয়ার্ল্ডফিশের পর্যালোচনায় বলা হয়, পাঙ্গাস ও নাইলোটিকা তেলাপিয়াপ্রধান বাণিজ্যিক পুকুরে কৈ, শিং ও মাগুরও উৎপাদিত হয়, আর পাঙ্গাস, তেলাপিয়া ও কৈ ঢাকা ও অন্য শহরের মাছের বাজারে ক্রমেই প্রধান হয়ে উঠছিল।

খাদ্য ও পানির মান
মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউল অনুযায়ী পাঙ্গাসের খাবারে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আমিষ থাকা দরকার। খামারে তৈরি খাবারের জন্য মডিউলে উপকরণের হার দেওয়া আছে: চালের কুঁড়া বা গমের ভুসি ৩৫ শতাংশ, খৈল ৪৫ শতাংশ, ফিশমিল ৫ শতাংশ, ফিশ কনসেনট্রেট ১০ শতাংশ, আটা ৫ শতাংশ এবং ভিটামিন প্রিমিক্স ০.১ শতাংশ, যাতে প্রায় ৩০ শতাংশ আমিষ নিশ্চিত হয়। বাজারের পিলেট খাবারও দেওয়া যায়, তবে তাতে ৩০ শতাংশ আমিষ থাকতে হবে। দৈনিক খাবার দিতে হবে মাছের দেহের ওজনের ৮ শতাংশ থেকে শুরু করে মাছ বড় হওয়ার সঙ্গে ১ শতাংশ পর্যন্ত, দিনে দুবার; পিলেট খাবার পুকুরের বিভিন্ন জায়গায় ছিটিয়ে এবং তৈরি খাবার পুকুরে বসানো ট্রেতে দেওয়া ভালো।
খাবারই সবচেয়ে বড় খরচ। ওয়ার্ল্ডফিশের ২০১১ সালের পর্যালোচনায় মুনিরের ২০০৯ সালের এক গবেষণার বরাতে বলা হয়, ত্রিশালে মোট উৎপাদন খরচের ৮২ শতাংশই ছিল খাবারের, আর গড় খাদ্য রূপান্তর হার ছিল ২.০৪; একই বছরে আলীর গবেষণায় এই হার ছিল ২। ভিয়েতনামের খামারের বর্ণনায় এফএওর তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, পালন পর্যায়ের খরচের ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশ খাবারের।
বেশি খাবার দিলে পুকুরের পানিতে শৈবাল বেড়ে যায়, আর মিশ্র পুকুর অনেকটা তারই জবাব। এডওয়ার্ডস ও করিম ২০০৭ সালে লেখেন, ময়মনসিংহের চাষিরা উদ্ভিদকণা কমাতে পাঙ্গাসের সঙ্গে ৫ থেকে ১০ শতাংশ রুইজাতীয় কার্প ও ৫ থেকে ১০ শতাংশ তেলাপিয়া মজুদ করে মিশ্র চাষ গড়ে তোলেন; প্রথমে তাঁরা সিলভার কার্প দিয়েছিলেন, পরে তার জায়গায় তেলাপিয়া দেন, কারণ কম অক্সিজেনে তেলাপিয়া বেশি টিকে থাকে। ময়মনসিংহের ২০০৯ সালের খামারের তথ্য নিয়ে আলী, হক ও বেল্টনের যে গবেষণা ২০১৩ সালে অ্যাকোয়াকালচার রিসার্চ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়, তাতে খামারগুলোতে পাঙ্গাসের বাড়তি ১০ থেকে ২০ শতাংশ কার্প ও তেলাপিয়া উৎপাদনের তথ্য পাওয়া যায়। ওয়ার্ল্ডফিশের পর্যালোচনায় বলা হয়, এই বাড়তি মাছ, যা আহরিত ওজনের প্রায় ১৫ শতাংশ, আলাদা খাবার ছাড়াই বড় হয় এবং নিয়মিত বিক্রি করে পাঙ্গাসের খাবারের খরচ মেটাতে সাহায্য করে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউল সতর্ক করে, পানি ঘন সবুজ হয়ে গেলে রাতে অক্সিজেন কমে যায় এবং ভোরে মাছ পানির ওপর ভেসে খাবি খায়। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে অগভীর নলকূপের পরিষ্কার ঠান্ডা পানি দেওয়া, কিছুদিন খাবার ও সার বন্ধ রাখা এবং অতিরিক্ত শৈবাল নিয়ন্ত্রণে কিছু সিলভার কার্পের পোনা ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত খাবার ও তলার পচা জৈব পদার্থ থেকে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হলে মাছের ঘনত্ব কমিয়ে, কিছুদিন সার ও খাবার বন্ধ রেখে এবং নিয়মিত হররা টেনে তলার মাটি ওলট-পালট করতে হবে।
পানির মান মাছের স্বাদেও প্রভাব ফেলে। মৎস্য অধিদপ্তরের জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১৩ সংকলনে প্রকাশিত পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, পাঙ্গাস ও তেলাপিয়ার মাটির মতো ও বাসি দুর্গন্ধের মূল কারণ জিওসমিন ও ২-মিথাইলআইসোবর্নিওল নামের দুটি রাসায়নিক, যা নীলাভ সবুজ শৈবাল ও অ্যাকটিনোমাইসিটিস নামের অণুজীব তৈরি করে, আর অতিরিক্ত খাবারে পানির মান খারাপ হলে এগুলো বাড়ে। গবেষণায় প্রোবায়োটিক ও স্যান্ডফিল্টার পানির মান উন্নত করেছে, আর আহরণের পর মাছকে প্রবহমান পরিষ্কার পানিতে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা রাখার (ডেপুরেশন) পদ্ধতিতে দুর্গন্ধ অনেকটাই কমেছে। লেখকেরা জানান, তখন বাজারে চাষের মাঝারি আকারের রুই কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হলেও পাঙ্গাস বিক্রি হতো প্রায় ১০০ টাকায়, আর চাষি ও ক্রেতাদের মতে কম দামের প্রধান কারণ এই দুর্গন্ধ।
রোগবালাই ও প্রতিরোধ
মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউলে পাঙ্গাসের প্রধান রোগগুলোর বর্ণনা আছে। ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা মডিউলের ভাষায় পাঙ্গাসে ব্যাপক হারে দেখা যায়, শুরু হয় চোখের ভেতরে রক্তক্ষরণ দিয়ে; এরপর মুখ ও পায়ুপথ লাল হয়, সারা শরীরে শ্লেষ্মা দেখা দেয়, মাছ পানির ওপরের স্তরে অস্বাভাবিকভাবে সাঁতরায় এবং হঠাৎ মারা যায়; পানি দূষিত হলে অ্যারোমোনাস ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ রোগ হয়। ক্ষতরোগ পাঙ্গাসে ব্যাপক হারে দেখা যায় না, তবে মিশ্র চাষে কখনো কখনো দেখা যায় এবং এর শুরু অ্যাফানোমাইসিস নামের ছত্রাক থেকে। মডিউলে আরও আছে মাছের উকুন, পাঙ্গাসের পোনার লেজ ও পাখনা পচা রোগ, অ্যারোমোনাস ব্যাকটেরিয়াজনিত পেট ফোলা রোগ, শুধু পাঙ্গাসে দেখা দেওয়া মাথা ফাটা রোগ, যা পানিদূষণ ও ভিটামিন সির অভাবের সঙ্গে যুক্ত, এবং অতিভোজনে আঙুলে পোনার পেট ফাটা রোগ, যাতে দুই মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ মাছ মারা যেতে পারে।
এর কয়েকটি রোগের জন্য মডিউলে অ্যান্টিবায়োটিক ও অন্য রাসায়নিকের নাম আছে। এগুলো ওষুধ, তাই কোনটি কত মাত্রায় দেওয়া হবে এবং বিক্রির আগে কতদিন বিরতি রাখতে হবে, তা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার পরামর্শে ঠিক করা উচিত; এফএওর তথ্যপত্রেও বলা হয়েছে, তাদের তালিকায় চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের উল্লেখ কোনো সুপারিশ নয়। ক্ষতরোগের ক্ষেত্রে মডিউলে বলা হয়েছে, তখনো এর কোনো কার্যকর চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি, তবে পরিবেশ উন্নয়নের জন্য শতকে ১ কেজি হারে চুন দেওয়া যেতে পারে। মাথা ফাটা রোগে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার ও উন্নত পরিবেশ, আর পেট ফাটা রোগে সঠিক সময়ে সঠিক মাত্রায় খাবার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মডিউলে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, চাষিদের পক্ষে মাছের রোগের চিকিৎসা কষ্টসাধ্য, অনেক সময় অসম্ভব, তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। এর ধাপগুলো হলো: পুকুরে পরিমিত সূর্যালোকের ব্যবস্থা করা; পুকুর শুকিয়ে নিয়মিত চুন দেওয়া; কোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত পোনা মজুদ না করা; বাইরের অবাঞ্ছিত প্রাণী ও পানি ঢুকতে না দেওয়া; তলায় অতিরিক্ত কাদা না রাখা; পরিমিত সার ও খাবার দেওয়া; ঘন ঘন জাল না ফেলা এবং ঘোলাত্ব সৃষ্টির উৎস বন্ধ করা। ব্যাঙ, সাপ ও গুইসাপ আলাদা বিপদ: একটি ব্যাঙ দিনে ১০০ থেকে ২০০টি রেণু বা পোনা খেয়ে ফেলতে পারে। মডিউলে পাড় আগাছামুক্ত রাখা এবং পুরোনো ঘন জাল দিয়ে পুকুরে বেড়া দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আহরণ, দাম ও আয়
ওয়ার্ল্ডফিশের ২০১১ সালের পর্যালোচনা অনুযায়ী, বাংলাদেশে পাঙ্গাস সাধারণত সাত-আট মাস, সর্বোচ্চ দশ মাস পালন করে ০.৬ থেকে ১.০ কেজি ওজনে আহরণ করা হতো; পুঁজি বেশি এমন খামার আরও বেশি সময় রাখত, কারণ বড় মাছের দাম বেশি। প্রধান চাষ মৌসুম ছিল মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর, কিছু মাছ ডিসেম্বর পর্যন্তও তোলা হতো, আর মৌসুমের শুরুতে মজুদের জন্য শীতকালে পোনা পুকুরে রেখে দেওয়া হতো। মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউলে বলা হয়, পাঙ্গাসের ওজন ৫০০ গ্রামের বেশি হলে বাজারজাত করা যায় এবং জীবন্ত মাছ বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যায়। এফএওর তথ্যমতে, ভিয়েতনামে স্ট্রাইপড ক্যাটফিশ ছয় মাস বা তার কম সময়ে ১.০ থেকে ১.৫ কেজি হয়।
ব্যবস্থাপনাভেদে ফলনে বড় পার্থক্য হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউলে আধা-নিবিড় পাঙ্গাস চাষে হেক্টরে ২০ থেকে ৩০ টন এবং নিবিড় চাষে ৫০ থেকে ১০০ টন উৎপাদনের কথা আছে। আলী, হক ও বেল্টনের ময়মনসিংহের ২০০৯ সালের জরিপে পাঙ্গাসের গড় উৎপাদনশীলতা ছিল হেক্টরে ৩৬.৯ টন, আর ৮৭.৯ শতাংশ খামার হেক্টরে ১৫ থেকে ৬৫ টন উৎপাদন করত। এডওয়ার্ডস ও করিম ২০০৭ সালে প্রতি ফসলে হেক্টরে ২৫ থেকে ৩০ টন ফলনের কথা লেখেন।
মৎস্য অধিদপ্তরের মডিউলে ২০০৯ সালের দামে এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) পুকুরের একটি নমুনা আয়-ব্যয়ের হিসাব আছে, যেখানে ৬,৬০০টি পাঙ্গাস, ৫০টি কাতলা, ৮০টি রুই, ২০টি মিরর কার্প ও ৫০টি মাগুরের পোনা মজুদ ধরা হয়েছে। মোট খরচ ধরা হয় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯১০ টাকা, যার মধ্যে ৪,৭২৫ কেজি সম্পূরক খাবারেই ১ লাখ ২২ হাজার ৮৫০ টাকা। ১০ শতাংশ মৃত্যুহার বাদ দিয়ে প্রতিটি পাঙ্গাস গড়ে ৬০০ গ্রাম ধরে মোট ৩,৮৯০ কেজি মাছ, যার দাম ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৬০ টাকা, আর এক ফসলে নিট লাভ ৪২ হাজার ৪৫০ টাকা দেখানো হয়। মডিউলে সতর্ক করা হয়েছে, এই লাভ পেতে হলে সুষম খাদ্য প্রয়োগ, সার্বিক চাষ ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে সফল হতে হবে।
বাস্তবে লাভের হার ছিল কম। ওয়ার্ল্ডফিশের পর্যালোচনায় মুনিরের গবেষণার বরাতে বলা হয়, ত্রিশালে খামার পর্যায়ে গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ৪৬.৩৯ টাকা, যাতে কেজিতে লাভ থাকত মাত্র ২.৫৩ টাকা, যদিও হেক্টরপ্রতি বেশি উৎপাদনের কারণে মোট লাভ বড় অঙ্কের হতো। উৎপাদনের প্রায় সবটাই দেশে খাওয়া হতো: গ্লোবাল অ্যাকোয়াকালচার অ্যাডভোকেটের ২০১২ সালের নিবন্ধে পাঙ্গাসকে বাংলাদেশের সবচেয়ে সস্তা মাছগুলোর একটি হিসেবে 'গরিবের মাছ' বলা হয়েছে, আর ওয়ার্ল্ডফিশের পর্যালোচনায় রপ্তানির সামান্য কিছু চালানের কথা আছে, যেমন ২০০৯ সালে খুলনা থেকে বুলগেরিয়ায় পাঠানো ৪.৬ টন ফিলে।

ছবি: Ujjalmc / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মৎস্য অধিদপ্তর (ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ ২০১৫-১৬; মনোসেক্স তেলাপিয়া ও পাঙ্গাস চাষ ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ মডিউল, ২০০৯; জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১৩ সংকলন), বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, এফএও কালচারড অ্যাকোয়াটিক স্পিসিজ ইনফরমেশন প্রোগ্রাম, ওয়ার্ল্ডফিশ, অ্যাকোয়াকালচার রিসার্চ, গ্লোবাল অ্যাকোয়াকালচার অ্যাডভোকেট





মন্তব্য
(০)