২০২৫ সালের মার্চে মেঘনা নদীতে মাছ ধরার দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা চলার সময় লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলার প্রায় ৫২ হাজার জেলে সরকারের খাদ্য সহায়তার (চাল) বাইরে ছিলেন। জাগো নিউজ ২৪-এর লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি ২০ মার্চ এই তথ্য জানান। প্রতিবেদনে বলা হয়, সহায়তা না পেয়ে অনেক জেলে বাধ্য হয়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছিলেন। কয়েকজন জেলে ও জেলেদের একটি সংগঠনের নেতা তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন, আর জেলা মৎস্য কর্মকর্তারা তালিকা থেকে বাদ পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন।
নিষেধাজ্ঞা ও অভয়াশ্রম
জাটকা (ইলিশের পোনা) রক্ষা ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছর মার্চ ও এপ্রিল মাসে এই এলাকায় নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল পর্যন্ত মেঘনার প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা এর আওতায়। এনটিভির ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদপুর অংশে মতলব উত্তরের ষাটনল থেকে হাইমচরের চরভৈরবী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার এলাকায় সেদিন মধ্যরাত থেকে নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়, চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত।
এই সময় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা, মজুত, পরিবহন ও বাজারজাত করা নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে এক থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। ইলিশ (Tenualosa ilisha) বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এটি ডিম ছাড়তে সাগর থেকে নদীতে উঠে আসে, আর নদীতে বেড়ে ওঠা ছোট ইলিশকে জাটকা বলা হয়।

কত জেলে সহায়তা পাচ্ছিলেন
জাগো নিউজের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর জেলায় নিবন্ধিত জেলে ছিলেন ৪৬ হাজার ৪৯ জন। যাচাই-বাছাইয়ের পর সর্বশেষ তালিকায় এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ২৮০ জনে, যাঁদের মধ্যে ২৮ হাজার ২৪৪ জনের চাল পাওয়ার কথা। বেসরকারি হিসাবে জেলায় জেলে প্রায় ৬০ হাজার। চাঁদপুরে নিবন্ধিত জেলে ৪৫ হাজার, তাঁদের মধ্যে খাদ্য সহায়তা পাচ্ছিলেন ৪০ হাজার ৫ জন। দুই জেলা মিলিয়ে প্রায় ৫২ হাজার জেলে চাল পাচ্ছিলেন না। প্রত্যেক তালিকাভুক্ত জেলের চার কিস্তিতে ৪০ কেজি করে মোট ১৬০ কেজি চাল পাওয়ার কথা।
জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, ১৮ বছরের কম বয়সী এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নেই এমন জেলেদের নিবন্ধন তালিকায় রাখা হয়নি। অথচ অনেকে বাবা-চাচার সঙ্গে ৮ থেকে ১০ বছর বয়স থেকেই নদীতে মাছ ধরতে যান। রায়পুরের উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইউছুফ মিয়া বলেন, চাল বিতরণ চলছে, তবে তালিকার বাইরে অনেক জেলে রয়ে গেছেন এবং তাঁরা ইউপি কার্যালয়ে ধরনা দিচ্ছেন।
চাল বিতরণ ঘিরে ১৭ মার্চ দুপুরে চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। স্থানীয়দের বরাতে জাগো নিউজ জানায়, কার্ড ছাড়া কিছু জেলে চাল নিতে চাইলে কথা কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষ বাধে এবং অন্তত ৩৫ জন আহত হন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সেদিন ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স এলাকার এই ঘটনায় ১০ জন আহত হওয়ার খবর দেয় এবং জানায়, পুলিশ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।

জেলেদের অভিযোগ ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য
চাঁদপুরের হাইমচর মাছঘাট এলাকার জেলে মো. লতিফ জাগো নিউজের কাছে অভিযোগ করেন, স্থানীয় একজন ইউপি সদস্য (মেম্বার) তাঁর কাছে ৪ হাজার টাকা চেয়েছিলেন এবং টাকা না দেওয়ায় তিনি চাল পাচ্ছেন না। আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, ‘মেম্বার আরতন (আমার কাছে) ৪ হাজার টিয়া (টাকা) চাইছে।’ কোন মেম্বার, জানতে চাইলে আরও বিপদে পড়ার আশঙ্কায় তিনি নাম বলেননি। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কারও নাম বা বক্তব্য আসেনি।
কমলনগরের লুধুয়া ঘাটের জেলে শরিফ হোসেন ও রায়পুরের চরবংশীর নাইয়াপাড়ার জেলে মহব্বত আকন অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক কারণে স্থানীয় ইউপি সদস্য তাঁদের নাম নিবন্ধন তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, তাঁদের ছেলে ও ভাতিজারা ৮ থেকে ১০ বছর ধরে নিয়মিত নদীতে মাছ ধরলেও চালের তালিকায় নাম আসেনি, অথচ টাকা দিয়ে অন্য পেশার লোকেরা এই সুবিধা নিচ্ছেন। লক্ষ্মীপুর জেলে ফেডারেশনের সভাপতি মোস্তফা বেপারীও তালিকায় স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেন এবং বলেন, চাল ওজনে কম দেওয়া হয়।
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, সর্বশেষ নিবন্ধন তালিকা করার সময় যাঁদের বয়স ১৮ বছরের নিচে ছিল তাঁদের তালিকাভুক্ত করা হয়নি, তাই অনেকে বাদ পড়েছেন; জেলে নিবন্ধনে কোনো অনিয়ম হয়নি। চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা গোলাম মেহেদী হাছান জানান, নদীতে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে জেলার ৪০ হাজার ৫ জন জেলেকে চার দফায় ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে, তবে নিবন্ধিতসহ আরও কিছু জেলে সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, এনটিভি, উইকিপিডিয়া (ইলিশ)





মন্তব্য
(০)