২০২৫ সালের ২৭ জুন শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছিল, কিন্তু চাহিদার তুলনায় ঘাটে ইলিশ ছিল অনেক কম। ঘাটের ব্যবসায়ীরা জাগো নিউজকে জানান, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ মণ ইলিশ বেচাকেনা হতো, সেখানে তখন তা ৫০ থেকে ১০০ মণে এসে দাঁড়িয়েছিল।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘাটে যে ইলিশ আসছিল তা আকারে বড় এবং স্থানীয় নদীর; এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। অনেক ক্রেতা আড়ত ঘুরে দাম জেনে কিছু না কিনেই ফিরে যান। ব্যবসায়ীরা এর কারণ হিসেবে পদ্মা ও মেঘনায় জেলেদের জালে কম ইলিশ ধরা পড়া এবং দক্ষিণাঞ্চল থেকে ট্রলারে ইলিশের চালান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তাঁরা মৌসুমের মূল মাছের জন্য বৃষ্টি আর নদীর পানি বাড়ার অপেক্ষায় ছিলেন।
ছুটির দিনে ক্রেতার ভিড়, ঘাটে মাছ কম
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭ জুন সকাল থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ক্রেতারা ঘাটের সারি সারি আড়ত ঘুরে দেখেন। কেউ দুটি, কেউ পাঁচ থেকে সাতটি ইলিশ কিনে নিয়ে যান, আবার কেউ কেউ দাম শুনে হতাশ হয়ে ফিরে যান। শুক্রবার বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিন। চাঁদপুর শহরে পদ্মা ও মেঘনার মিলনস্থলের পাশে অবস্থিত এই ঘাটে এমন দিনে মাছের ক্রেতার পাশাপাশি ঘুরতে আসা মানুষও ভিড় করেন।
ঢাকা থেকে আসা পারভেজ নামের একজন ক্রেতা বলেন, ‘আমরা চার বন্ধু ঢাকা থেকে লঞ্চ যোগে চাঁদপুর বড় স্টেশন তিন নদীর মোহনায় ঘুরতে এসেছি। মোহনার পাশে ইলিশ ঘাট। যার কারণে মাছ দেখতে এসেছি। তবে এখানে এসে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ইলিশের স্তূপ নেই আবার দামও বেশি। পুরো আড়ত ঘুরে দেখছি সম্ভব হলে ইলিশ কিনে নিয়ে যাবো।’
তাঁর বর্ণনার ছবিটিই ছিল প্রতিবেদনের মূল কথা: ছুটির দিনে ক্রেতার ভিড় আছে, চাঁদপুরের ইলিশের চাহিদাও প্রবল, কিন্তু আড়তের মেঝেতে রুপালি মাছের স্তূপ নেই, ঘাটে বিক্রির মতো মাছ সামান্য।
ধরা, দাম ও পদ্মা সেতু নিয়ে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
ইলিশ ব্যবসায়ী নবীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ইলিশের মৌসুম চললেও চাঁদপুরে পদ্মা-মেঘনায় জেলেদের জালে ইলিশ কম ধরা পড়ছে। তাঁর ভাষায়, ‘সারাদেশে চাঁদপুরের ইলিশের ব্যাপক চাহিদার অনুপাতে বাজারে মাছ নেই। আগে ট্রলারে করে দক্ষিণাঞ্চলের ইলিশ চাঁদপুর মাছঘাটে আসতো কিন্তু পদ্মা সেতু হওয়ার পর সেই মাছ এখন আর আসে না। সামনে ইলিশের ভরা মৌসুম, নদীর পানি ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ইলিশ ধরা পড়বে তখন দাম কমবে।’
তিনি যে সেতুর কথা বলেছেন, সেই পদ্মা বহুমুখী সেতু উদ্বোধন হয় ২০২২ সালের ২৫ জুন। পদ্মা নদীর ওপর ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দ্বিতল সড়ক ও রেলসেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেতুর সঙ্গে ঘাটে ট্রলারের চালান কমার সম্পর্কটি ব্যবসায়ীর নিজের ব্যাখ্যা; মাছ এখন কোন পথে যায়, তার কোনো হিসাব প্রতিবেদনে ছিল না।
আড়তের আরেক ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, ‘মাছঘাটে আসা এখনকার ইলিশের সাইজ বড়। এখনকার ইলিশ স্থানীয় নদীর। শুক্রবার থাকায় ক্রেতা সমাগম বাড়লেও বিক্রি কম। অধিকাংশ ক্রেতারা দরদাম যাচাই করে না কিনে চলে যায়। যার কারণে কিছু ইলিশ সরবরাহ থাকলে আগের মতো বিক্রি নেই।’
তিনি সেদিন ঘাটের দাম জানান এভাবে:
- এক কেজি ওজনের ইলিশ: ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা;
- ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের ইলিশ: ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা;
- এক কেজি ওজনের বড় ইলিশ: ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা।
২৭ জুনের আগের কয়েক সপ্তাহেও ছিল সরবরাহ সংকট
২৭ জুনের এই চিত্র একই ঘাট থেকে কয়েক সপ্তাহ ধরে আসা খবরেরই ধারাবাহিকতা। ২০২৫ সালের ১৭ মে বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, নদীর অভয়াশ্রমে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে চাঁদপুরের বাজারে ইলিশ ফিরেছে, তবে চাঁদপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বা বড় স্টেশন মাছঘাটে দিনে আসছিল মাত্র প্রায় ৫০ মণ। দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকা হাতিয়া, ভোলা, সন্দ্বীপ ও চরফ্যাশন থেকে পিকআপ ভ্যানে দিনে ৪০ থেকে ৫০ মণ ইলিশ আসছিল, আর যে ট্রলারগুলো সাধারণত এক চালানে ১৫০ থেকে ২০০ মণ মাছ আনে, সেগুলো তখনো চলাচল শুরু করেনি।
ইউএনবির হিসাবে সে সপ্তাহে চাঁদপুরের বাজারে এক কেজির ইলিশের দাম ছিল প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা, কয়েক সপ্তাহ আগে যা ছিল ৩ হাজার টাকা; ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল কেজি ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়, আগে যা ছিল ২ হাজার ৩০০ টাকা। শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত মাছবাজার বিপণীবাগে এক কেজির পদ্মার ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, আর এক কেজির উপকূলীয় ইলিশ ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। মৎস্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা সংস্থাটিকে বলেন, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে; আর চার দশকের বেশি সময় ধরে ব্যবসায় থাকা স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি বলেন, বর্ষা এলে নদীর ইলিশ বাড়বে।
২০২৫ সালের ৩ জুন দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, বড় স্টেশন মাছবাজারে প্রকাশ্য নিলামে ২ কেজি ৪৮০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ ১৩ হাজার ৩৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে; প্রতিবেদনে একে ওই বাজারে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ দামে ইলিশ বিক্রি বলা হয়, আর নিলামে অন্তত ৩০ জন খুচরা বিক্রেতা অংশ নেন। মৎস্য বণিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সে সময় সাধারণত প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ মণ ইলিশ আসার কথা, কিন্তু আসছিল ৫ থেকে ১০ মণের বেশি নয়। সমিতির সাধারণ সম্পাদক পত্রিকাটিকে বলেন, চাঁদপুর মাছবাজারে ইলিশের অনেকটা আকাল চলছে, ‘ইলিশ যেন এখন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে।’
২০২৫ সালের ২১ জুন দৈনিক দেশ রূপান্তর ঘাটের ব্যবসাকে অস্তিত্ব সংকটে বলে বর্ণনা করে। একজন ইলিশ বিক্রেতা পত্রিকাটিকে বলেন, চার-পাঁচ বছর আগেও ঘাটে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার মণ মাছ আসত, তখন আসছিল ৪০ থেকে ৫০ মণ। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সভাপতি জানান, ২০২০-২১ অর্থবছরে এই ঘাটে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মণ মাছ বিক্রি হয়েছিল এবং ২০২২ সাল থেকে প্রতিবছর সরবরাহ কমেছে। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, যে এক কেজির ইলিশ একসময় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, তা তখন বিক্রি হচ্ছিল ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
একই প্রতিবেদনে ঘাটের ওপর নির্ভরশীল মানুষের কথাও উঠে আসে। আড়তদাররা জানান, তাঁরা জেলেদের লাখ লাখ টাকা দাদন দিয়েছেন, অর্থাৎ মৌসুমের আগাম ঋণ, যা জেলের নৌকাকে একটি আড়তের সঙ্গে বেঁধে রাখে; মাছ না আসায় তাঁরা লোকসানে পড়ছেন। শ্রমিকেরা বলেন, আগে সারা দিন কাজ থাকত, এখন মাছের নৌকার অপেক্ষায় বসে থাকতে হয়; ঘাটের পাশের এক হোটেল মালিক বলেন, বাজারে মানুষ থাকলেই তাঁদের ব্যবসা চলে। পত্রিকাটি জানায়, অন্যত্র নতুন আড়ত গড়ে ওঠায়ও বড় স্টেশনে মাছের চালান কমেছে। চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক পত্রিকাটিকে বলেন, গত কয়েক বছরে ইলিশের উৎপাদন কিছুটা কমলেও চাষের মাছের উৎপাদন বেড়েছে এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে কাজ চলছে।
চাঁদপুর, তার নদী ও বড় স্টেশন মাছঘাট
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, চাঁদপুর চট্টগ্রাম বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১,৬৪৫.৩২ বর্গকিলোমিটার। এর প্রধান নদী মেঘনা, ডাকাতিয়া, গোমতী ও ধনাগোদা, আর জেলার পশ্চিমে মেঘনা। চাঁদপুর মহকুমা গঠিত হয় ১৮৭৮ সালে, তখন তা ত্রিপুরা জেলার অংশ ছিল; জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ১৬ হাজার ১৮, আর দর্শনীয় স্থানের তালিকায় বাংলাপিডিয়া শহরের জেলা ইলিশ চত্বরের নাম রেখেছে। যে চাঁদপুর সদর উপজেলায় ঘাটটি, সেখানকার প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় জ্ঞানকোষটি ইলিশকে প্রথমে রেখেছে, আর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নাম উল্লেখ করেছে।
এই বাণিজ্যের পেছনে আছে নদী। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র-যমুনার মিলিত প্রবাহ, যা পদ্মা নামে পরিচিত, ষাটনল থেকে ১৬ কিলোমিটার ভাটিতে চাঁদপুরের কাছে মেঘনার সঙ্গে মিলেছে; বর্ষায় এই সংগমস্থল প্রায় ১১ কিলোমিটার চওড়া হয়। এখান থেকে দক্ষিণে নদীটির নাম নিম্ন মেঘনা, যা বিশ্বের সবচেয়ে প্রশস্ত নদী ও বৃহত্তম মোহনাগুলোর একটি এবং তিনটি বড় নদীপ্রবাহের পানি বঙ্গোপসাগরে বয়ে নেয়। সাগর আর উজানের ডিম পাড়ার জায়গার মধ্যে ইলিশের যাতায়াতের পথ এই জলপথই।
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বড় স্টেশন মাছঘাট গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ আমলে, ডাকাতিয়া নদীর তীরে, যেখানে নদীটি মেঘনায় মিশেছে; সেখানে ইলিশ সহজলভ্য ছিল এবং যোগাযোগব্যবস্থাও ছিল সুবিধাজনক। এই ঘাট থেকে সড়ক ও রেলপথে ইলিশ যায় সারা দেশে, আর ঘাটকে ঘিরে চলে শ্রমিক, বরফকল, প্যাকেজিং, হোটেল ও চায়ের দোকানের জীবিকা।

ইলিশ: জাতীয় মাছ ও তার জীবনচক্র
বাংলাপিডিয়া জানায়, ইলিশ হেরিং গোত্রের (ক্লুপিডি) টেনুয়ালোসা গণের মাছ এবং বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। এর দেহ চাপা, রুপালি ধাতব রঙের। দৈর্ঘ্যে ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে, তবে সাধারণত ধরা পড়া মাছ ৩৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার, আর বড় একটি ইলিশের ওজন প্রায় আড়াই কেজি। স্ত্রী ইলিশ পুরুষের চেয়ে দ্রুত বাড়ে ও বড় হয়, আর মাছটি এক থেকে দুই বছরে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ নিয়ে টিবিএস বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, এক কেজি ওজনের ইলিশ সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, আর দুই কেজির বেশি ওজনের ইলিশ ৬০ থেকে ৬২ সেন্টিমিটার।
ইলিশ অ্যানাড্রোমাস বা অভিপ্রয়াণী মাছ: প্রাপ্তবয়স্ক মাছ সাগর থেকে নদীর উজানে মিঠা পানিতে এসে ডিম ছাড়ে, ভাসমান ডিম ফুটে পোনা বের হয়, পোনা নদীর খাতে বড় হয়ে খাবার ও বৃদ্ধির জন্য সাগরে নেমে যায়, তারপর প্রজননক্ষম হয়ে আবার নদীতে ফেরে। বড় একটি স্ত্রী ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, ইলিশ কমবেশি সারা বছর ডিম ছাড়ে, তবে ফেব্রুয়ারি-মার্চে একটি ছোট এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রধান প্রজনন মৌসুম; মাছটি মূলত নীলাভ সবুজ শৈবাল, ডায়াটম ও ক্ষুদ্র কবচী প্রাণীর মতো প্ল্যাংকটন খায়।
ইলিশের পোনার নাম জাটকা। পদ্মা, যমুনা ও মেঘনার নার্সারি এলাকায় ডিম ফুটে বের হওয়ার পর ছয় থেকে দশ সপ্তাহ বেড়ে তারা সাগরের পথে নামতে শুরু করে। মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের এপ্রিলের ব্রিফিং নিয়ে টিবিএস বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ১০ ইঞ্চি বা ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত আকারের ইলিশকে জাটকা ধরা হয়। ১৯৯২-৯৪ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক জরিপে হিসাব করা হয়েছিল, প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিলে নানা ধরনের সূক্ষ্ম জালে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টন জাটকা ধরা পড়ে, যার অর্ধেকের বেশি মেঘনায়। চাঁদপুরের নদী-অভয়াশ্রমে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞাও বছরের এই সময়েই পড়ে।
প্রাপ্তবয়স্ক ইলিশ মূলত স্থির বা ভাসমান ফাঁসজাল দিয়ে ধরা হয়, অল্প পরিমাণে বেড়জাল ও তোলা জালেও ধরা পড়ে। নদীতে সাধারণত যন্ত্রবিহীন একটি নৌকা বা দুই নৌকার দল মাছ ধরে, আর সাগরে ধরা হয় ১০ থেকে ১৩ মিটারের যন্ত্রচালিত নৌকা বা ট্রলারে। বাংলাপিডিয়া জানায়, সংগ্রাহক নৌকা, বড় স্টেশনের মতো পাইকারি বাজার এবং পরিবহনকারী ব্যবসায়ীদের একটি ব্যবস্থা দেশের ভেতরের বাজারে এই মাছ পৌঁছে দেয়। ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর ইলিশকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে।

জাতীয় হিসাবে ইলিশ উৎপাদন
২০২৫ সালের মৌসুমের আগে জাতীয় পর্যায়ের সরকারি হিসাবে দেখা যায় দীর্ঘ সময়ের বৃদ্ধির পর একটি পতন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানান, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে; ১৫ বছরে বৃদ্ধি প্রায় ৯২ শতাংশ, টিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী।
২০২৫ সালের ৭ এপ্রিল জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের ব্রিফিং নিয়ে টিবিএস বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে ৫ লাখ ২৯ হাজার মেট্রিক টন। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১ শতাংশের বেশি; বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হয় এ দেশের নদ-নদী, মোহনা ও সাগর থেকে, এবং ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে।
এই জাতীয় হিসাবে সাগরে ধরা ইলিশও আছে, যা নামে উপকূলের ঘাটে। বড় স্টেশনের ব্যবসায়ীরা বলছিলেন আরও সীমিত একটি বিষয়ের কথা: পদ্মা-মেঘনার নদীর ইলিশ আর দক্ষিণ থেকে আসা চালান মিলিয়ে দেশের ভেতরের একটি ঐতিহ্যবাহী বাজারে কতটা মাছ পৌঁছাচ্ছে। এই পার্থক্যের পটভূমি পাওয়া যায় বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়: প্রায় ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ইলিশ আহরণ মূলত পদ্মা, মেঘনা, করতোয়া, রূপসা, শিবসা ও পায়রার মতো উজানের নদীতে সীমিত ছিল; এরপর উজানে তা অনেক কমে গেছে, আর আহরণ এখন মূলত ভাটির নদী, মোহনা, উপকূল ও সাগরে।
২০২৪-২৫ মৌসুমের নিষেধাজ্ঞাগুলো
২০২৫ সালের জুনের শেষ নাগাদ চাঁদপুর অঞ্চলের ইলিশ আহরণ কয়েক দফা নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে এসেছিল। এসব নিষেধাজ্ঞা দেয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, আর তা কার্যকর করে মৎস্য অধিদপ্তর, পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী।
২০২৪ সালের শরতে প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা চলে ২২ দিন, ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত; এ সময় সারা দেশে ইলিশ ধরা, বিক্রি, মজুত ও পরিবহন নিষিদ্ধ ছিল। ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘোষণার সময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, এ সময় ডিম ছাড়া মা ইলিশ রক্ষাই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য; প্রতিবেদনে চাঁদপুরকে দেশের বৃহত্তম ইলিশ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি বলা হয়।
চাঁদপুরের অভয়াশ্রমে ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল, মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত পদ্মা-মেঘনার ৭০ কিলোমিটার এলাকায়। দৈনিক ইত্তেফাক ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জানায়, নিষেধাজ্ঞার আওতায় জেলার প্রায় ৪৪ হাজার নিবন্ধিত জেলে, এবং তাঁদের প্রত্যেকের চার মাস ভিজিএফ সহায়তার আওতায় ৪০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা। চাঁদপুর ও হাইমচরে টাস্কফোর্স নিষেধাজ্ঞা তদারক করে, আর জেলার পুলিশ সুপার জানান, নৌ পুলিশ দিনরাত অভয়াশ্রমে টহল দেবে। উদ্দেশ্য ছিল সাগরমুখী জাটকা রক্ষা।
টিবিএস বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ২০২৫ সালের ৮ থেকে ১৪ এপ্রিল সারা দেশে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন করে, প্রতিপাদ্য ছিল ‘জাটকা ধরা বন্ধ হলে, ইলিশ উঠবে জাল ভরে’।
সাগরে ২০২৫ সালে সরকার বঙ্গোপসাগরের বার্ষিক নিষেধাজ্ঞা ৬৫ দিন থেকে কমিয়ে ৫৮ দিন করে; সুপারিশ করেছিল মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য অংশীজনের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি কারিগরি কমিটি। দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত না থাকায় সেসব দেশের জেলেরা লাভবান হচ্ছিলেন। মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সামুদ্রিক মৎস্য বিধিমালা ২০২৩-এর আওতায় ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সব ধরনের নৌযানে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। শুধু ভোলা জেলাতেই প্রায় ৬৫ হাজার সমুদ্রগামী জেলে এ সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখেন, আর প্রত্যেক নিবন্ধিত জেলে পান ৭৮ কেজি চাল।
২৭ জুন ব্যবসায়ীরা সামনের মৌসুম নিয়ে যা বলছিলেন, তা এই পঞ্জিকার সঙ্গে মেলে। নদীর অভয়াশ্রমের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছিল ৩০ এপ্রিল, সাগরের নিষেধাজ্ঞা ১১ জুন; আর বাংলাপিডিয়া জানায়, স্থানীয় জেলেরা মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অভিপ্রয়াণী প্রাপ্তবয়স্ক ইলিশ ধরেন, যার প্রধান প্রজনন মৌসুম সেপ্টেম্বর-অক্টোবর।

নদীতে ইলিশ কম কেন: ব্যবসায়ী ও গবেষকদের মত
ঘাটের মানুষ সংকটের কয়েকটি কারণ বলেছেন। নবীর হোসেন পদ্মা-মেঘনায় কম ধরা পড়া এবং দক্ষিণের ট্রলারের চালানের কথা বলেছেন, যা তাঁর মতে পদ্মা সেতু চালুর পর আর আসে না; দেশ রূপান্তরের সূত্রগুলো যোগ করেছে অন্যত্র নতুন আড়ত গড়ে ওঠার কথা। ব্যবসায়ীরা আশা করছিলেন, বর্ষার বৃষ্টি আর নদীর পানি বাড়লে সরবরাহ ফিরবে; ইউএনবিকে মে মাসে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাও জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে প্রচুর ইলিশের আশা করেছিলেন।
গবেষকেরা নদীর ইলিশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের কথা বলে আসছিলেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের একজন সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, দৈনিক ইত্তেফাক যাঁকে একজন শীর্ষস্থানীয় ইলিশ গবেষক হিসেবে উল্লেখ করেছে, বলেন, দূষণ ও অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের কারণে মেঘনা-পদ্মায় ইলিশ কমেছে। তিনি পানির মান উন্নত করা ও বালু উত্তোলন কমানোর আহ্বান জানান এবং বলেন, সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় জাটকা সংরক্ষণ করলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে।
দেশের ভেতরের নদীতে ইলিশ কমার যেসব কারণকে মৎস্যবিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরে দায়ী করে আসছেন, বাংলাপিডিয়া সেগুলোর তালিকা দিয়েছে:
- ভারতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর গঙ্গায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং এর ফলে ব্যাপক পলি জমা;
- নির্বিচারে জাটকা ধরা;
- অভিপ্রয়াণের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং ডিম ছাড়া, খাদ্য গ্রহণ ও পোনা বেড়ে ওঠার জায়গা হারিয়ে যাওয়া;
- নদীদূষণ বেড়ে যাওয়া;
- উপকূলীয় এলাকায় যন্ত্রচালিত ইলিশ ধরার নৌকার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, যা ডিম ছাড়তে উজানে যাওয়ার আগেই মাছ ধরে ফেলে;
- বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প, যার মধ্যে চাঁদপুর সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প এবং মেঘনা-ধনাগোদা সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প জাটকার নার্সারি এলাকার ক্ষতি করেছে বলে জ্ঞানকোষটি উল্লেখ করেছে।
ছবি: AsikBinRahim / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ইউএনবি, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দেশ রূপান্তর, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো (ইউএনবি), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)