চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও জলাবদ্ধতায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়। জাগো নিউজ ২৪ ১৭ জুলাই জানায়, তিন দিন বৃষ্টি বন্ধ থাকায় পানি নামতে শুরু করলে ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হতে থাকে। উপজেলার তিন দপ্তরের হিসাবে ক্ষতি প্রায় ১৩ কোটি টাকা হলেও ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি ৩০ থেকে ৩৫ কোটি টাকার কাছাকাছি। এর প্রভাবে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কাঁচাবাজারে প্রতি কেজি সবজির দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে যায়।
সরকারি হিসাব আর চাষিদের দাবি
উপজেলার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে কৃষি খাতে ক্ষতি ৮ কোটি, মৎস্য খাতে ৩ কোটি এবং প্রাণিসম্পদ খাতে ২ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর ১৭৬টি; ধানের ১১২ হেক্টর ও সবজির ১৮০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর প্রাণিসম্পদ খাতে ১৬০ একর জমির ঘাস চাষ নষ্ট হয়। ভুক্তভোগীদের মতে, ক্ষতি সবচেয়ে বেশি কৃষি ও মৎস্য খাতে।
উপজেলায় সবচেয়ে বেশি চাষাবাদ হয় সৈয়দপুর, বারৈয়ারঢালা, মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে, আর জলাবদ্ধতাও হয় এই পাঁচ ইউনিয়নেই বেশি। সৈয়দপুরের কৃষক শাহ আলম জানান, প্রায় ৩০ শতক জমিতে প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ করে তিনি ঝিঙা চাষ করেছিলেন; ঝিঙা ধরা শুরু হতেই জলাবদ্ধতায় পুরো খেত জ্বলে যায়, অথচ উপজেলা কৃষি দপ্তরের কেউ তখনো তদারকিতে আসেননি। তাঁর কথায়, এবার পানি নামার পর ধান ও সবজির গাছ দ্রুত জ্বলে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে পানির সঙ্গে বিষাক্ত কিছু এসেছে।
সৈয়দপুরের মুরগির খামারি সেলিম উদ্দিন জানান, খামারে তোলা প্রায় ১০০০টি বাচ্চার মধ্যে পানি ওঠায় প্রায় ৫০০টি মারা যায়, এতে ক্ষতি হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। বারৈয়ারঢালার মৎস্যচাষি দিপু শর্মা জানান, তিন বন্ধু মিলে তাঁরা বড় দিঘি ও পুকুর মিলিয়ে ছয়টি জলাশয়ে মাছ চাষ করছিলেন; ভারী বর্ষণে সবগুলো ডুবে যায়, ক্ষতি প্রায় ছয় লাখ টাকা।
কৃষিবিদ কল্পনা রহমান জানান, মাঠে গিয়ে ক্ষতি পরিদর্শন চলছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মুনতাসির বিল্লাহ ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কল্লোল বড়ুয়াও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত চাষি ও খামারিদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে সেখানকার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৯৬২ সালের স্লুইস গেট, নিচু পশ্চিম অংশ
সীতাকুণ্ডের ভেতর দিয়ে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়কের পূর্ব পাশ উঁচু, পশ্চিম পাশ অনেকটা নিচু; কয়েক দিনের টানা বর্ষণে নিচু এলাকায় পানি জমে যায়, আর সাগর উপকূলের অধিকাংশ স্লুইস গেট নষ্ট থাকায় জলাবদ্ধতা তীব্র হয়। মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালীর কৃষক মোহাম্মদ আইয়ুব আলী প্রায় চার লাখ টাকা খরচ করে এক একর ৪০ শতক জমিতে লাউ ও চিচিঙ্গা চাষ করেছিলেন। তিনি জানান, গুলিয়াখালী উপকূলের স্লুইস গেটের ছয়টি কপাটের চারটিই নষ্ট, বাকি দুটি দিয়ে দ্রুত পানি নামে না। তাঁর দাবি, তাঁর ওয়ার্ডের প্রায় ৩০০ কৃষকের প্রত্যেকের দুই লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সীতাকুণ্ড কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী হিমু মহাজন জানান, উপজেলার অধিকাংশ স্লুইস গেট ১৯৬২ সালে নির্মিত, তাই বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে গেছে; নতুন করে নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। তাঁর মতে, উপজেলার খালগুলো পুরোপুরি খনন করা হলে বর্ষায় কৃষকেরা এই সমস্যা থেকে রেহাই পাবেন।
সমস্যাটি নতুন নয়। প্রথম আলো ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট জানায়, পানির স্রোতে বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের শিকদার খালের স্লুইস গেট ভেঙে যায় এবং জলাবদ্ধতায় ১৫০ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে যায়। ২০২৫ সালের আগস্টে সীতাকুণ্ডে ২৪ ঘণ্টায় ২০৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা ছিল দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ; তখনও কুমিরা, সৈয়দপুর, বারৈয়ারঢালা, মুরাদপুর ও পৌর এলাকার নিচু অংশ প্লাবিত হয়।

চট্টগ্রামজুড়ে রেকর্ড বৃষ্টি ও বন্যা
সেবারের দুর্যোগ ছিল জেলাজুড়ে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের হিসাবে ৭ জুলাই বিকেল ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম নগরীতে ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়; এর আগের রেকর্ড ছিল ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্টের ৪১১ মিলিমিটার। ১১ জুলাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানানো হয়, জেলায় ১৫ হাজার ৯১১ দশমিক ১৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর, দিঘি ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মৎস্য খাতে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলার আয়তন ৪৮৩ দশমিক ৯৭ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে মিরসরাই, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেল। ২০২২ সালের জনশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩৯৬। জাহাজভাঙা শিল্পের জন্য পরিচিত হলেও সীতাকুণ্ড মূলত কৃষিপ্রধান এলাকা।

ছবি: Syed Sajidul Islam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)