২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে টানা কয়েক দিনের বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও বান্দরবান পৌর এলাকায় জনদুর্ভোগ কাটেনি। ১৩ জুলাই সোমবার জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা কাদা, ময়লা-আবর্জনা ও পচনশীল বর্জ্য থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। একই সঙ্গে পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও দেখা দেয়।
সাঙ্গু উপচে যেভাবে ডুবেছিল শহর
বান্দরবান শহর চট্টগ্রাম বিভাগের পার্বত্য অঞ্চলে সাঙ্গু নদীর তীরে অবস্থিত জেলা সদর; বান্দরবান পৌরসভা ৯টি ওয়ার্ডে বিভক্ত। ডেইলি স্টারের ৮ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চার দিনের টানা ভারী বৃষ্টি আর উজানের পাহাড়ি ঢলে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়। সেদিন সাঙ্গুর পানি ছিল ১৫.৭৬ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ১৪.৮০ মিটার। ২৪ ঘণ্টায় ৩০৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। পৌর এলাকার মারমা বাজার, মেইন বাজার, কাশেমপাড়া ও আর্মীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়।
১১ জুলাইয়ের মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ডেইলি স্টারের তথ্যে, জেলার ৩৪টি ইউনিয়নের ২৯টিতে পানি ঢোকে, ৫০০টির বেশি গ্রামে হাজারো ঘরবাড়ি ডুবে যায় এবং এক লাখের বেশি মানুষ দুর্ভোগে পড়েন। পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পাঁচ হাজারের বেশি বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়, আর ৫৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন ৪ হাজার ৬০০-র বেশি মানুষ। জেলা প্রশাসন মোট ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছিল।

পানি নামার পর কাদা, বর্জ্য আর দুর্গন্ধ
১৩ জুলাই পৌরসভার আর্মীপাড়া, ক্যাচিংঘাটা, ইসলামপুর ও কালাঘাটা এলাকা ঘুরে জাগো নিউজের প্রতিবেদক দেখেন, পানি সরে গেলেও সড়ক, অলিগলি, ড্রেন, বাড়িঘর ও আঙিনাজুড়ে কাদা ও নানা ধরনের বর্জ্য জমে আছে। অনেক জায়গায় ড্রেন কাদায় ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছিল, ফলে পুরো এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
আর্মীপাড়ার বাসিন্দা মো. আবদুল করিম জানান, পানি নেমে গেলেও ঘরের ভেতরে ও বাইরে কাদার স্তূপ জমে আছে, চারদিকে দুর্গন্ধ, আর ছোট শিশুদের নিয়ে তারা উদ্বেগে আছেন। স্থানীয়রা জানান, পানির সঙ্গে ভেসে আসা প্লাস্টিক, গাছের ডালপালা, গৃহস্থালির বর্জ্য ও পচনশীল আবর্জনা বিভিন্ন স্থানে জমে আছে। এসব দ্রুত সরানো এবং জীবাণুনাশক ছিটানোর দাবি জানান তারা।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও আর্মীপাড়ার বাসিন্দা রিটল বিশ্বাস বলেন, বন্যার সময়ের চেয়ে এখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে; পচা আবর্জনার গন্ধে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত ময়লা সরানো না হলে কলেরা, ডায়রিয়াসহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়ে তিনি পৌরসভার কর্মকর্তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
বন্যার পর এমন ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)। সংস্থাটির পরামর্শ অনুযায়ী, বন্যার পানিতে আবর্জনা ও রোগজীবাণু থাকতে পারে; ডায়রিয়াজনিত রোগ ঠেকাতে সাবান-পানিতে হাত ধোয়া, দেয়াল ও মেঝে সাবান-পানিতে পরিষ্কার করে এক গ্যালন পানিতে এক কাপ ব্লিচ মিশিয়ে জীবাণুমুক্ত করা এবং পরিষ্কারের সময় রাবারের বুট ও প্লাস্টিকের দস্তানা পরা জরুরি।
লোকবল সংকটে ধীর পরিচ্ছন্নতা
পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জাগো নিউজকে জানান, পানি নামার পরপরই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু হয়েছে; বিভিন্ন ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা কাদা ও আবর্জনা সরাচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জীবাণুনাশক ছিটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ কাজ চলবে।
তবে পৌরসভার কনজারভেন্সি ইন্সপেক্টর দিদারুল হক চৌধুরী জানান, আশ্রয়কেন্দ্র ও দুর্যোগকবলিত এলাকায় খাদ্য সহায়তা চালু থাকায় লোকবল ও লজিস্টিক সংকট দেখা দিয়েছে, তাই বর্জ্য অপসারণ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে অপসারণের কাজ পুরোদমে শুরু হবে বলে জানান তিনি।

ছবি: Mohammed Tawsif Salam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)