যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে মিথ্যা ঘোষণায় ভারত থেকে আনা ইলিশ মাছের একটি চালান জব্দ করেছে বেনাপোল কাস্টমস। ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি, মঙ্গলবার রাতে বন্দরের ৩১ নম্বর ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি আটক করা হয়। কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘোষণাপত্রে বোয়াল, ফলি ও বাঘাইড়ের মতো 'সুইট ফিশ' বা মিঠাপানির মাছের কথা লেখা থাকলেও কায়িক পরীক্ষায় ২২৫টি প্যাকেজের একাংশে ভারতীয় ইলিশ পাওয়া যায়। জব্দ করা ইলিশের বাজারমূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা বলে জানানো হয়।
কীভাবে ধরা পড়ল চালানটি
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুটি ভারতীয় ট্রাক থেকে পণ্য খালাসের সময় সন্দেহ হলে বেনাপোল কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়। বেনাপোল স্থলবন্দরের ট্রাফিক পরিদর্শক শাহদত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, মঙ্গলবার রাতে প্রথমে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশির জন্য ইয়ার্ডে আসে, কিছু পরে আসেন কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মাছবাহী ট্রাক খোলার পর অন্য মাছের ভেতরে ইলিশ পাওয়া যায়।
ইলিশের পরিমাণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে দুই রকম হিসাব আসে। জাগো নিউজ জানায়, ২২৫টি প্যাকেজের মধ্যে ৫৪টিতে ইলিশ ছিল, যার ওজন সাড়ে তিন টন। অন্যদিকে দ্য ডেইলি অবজারভার বেনাপোল কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা উদ্ভব চন্দ্র পালের বরাতে জানায়, ৫৩টি কার্টন থেকে ৫ হাজার ৯৪৩ কেজি ইলিশ উদ্ধার করা হয়। ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের স্পষ্ট অমিল থাকায় পুরো চালানটি তাৎক্ষণিক জব্দ করা হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পচনশীল পণ্য বিবেচনায় অন্য মাছগুলো খালাসের ব্যবস্থা করা হলেও ইলিশ বাজেয়াপ্ত করা হয়। উদ্ভব চন্দ্র পাল সাংবাদিকদের বলেন, জব্দ করা মাছ কাস্টমস বিধি অনুযায়ী নিলামে তোলা হবে।

কারা জড়িত, কাস্টমস কী বলেছে
কাস্টমস সূত্রের বরাতে দুই সংবাদমাধ্যমই জানায়, জান্নাত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বৈধ পথে চালানটি আনার চেষ্টা করে; রপ্তানিকারক হিসেবে নাম ছিল আরজে ইন্টারন্যাশনালের। চালানটির সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লিংক ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি ও পাচারচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের একটি অভিযোগও উঠে আসে যে চালানটিতে পরীক্ষণ কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকতে পারে। এসব অভিযোগ তখন তদন্তাধীন ছিল।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ঘোষণাপত্রের সঙ্গে পণ্যের প্রকৃত অবস্থার স্পষ্ট অমিল পাওয়া গেছে, যা শুল্ক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন, এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জাগো নিউজকে তিনি আরও বলেন, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সবাই তদন্তের আওতায় রয়েছেন; কাস্টমসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর জড়িত থাকার প্রমাণ তদন্তে মিললে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের শুল্ক ফাঁকির কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বেনাপোলে প্রায় ১ হাজার ১৩ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে একই সূত্রের এমন অভিযোগও ছিল যে কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা চালানপ্রতি ঘুস নেন; প্রতিবেদনে এ অভিযোগের বিষয়ে কাস্টমসের আলাদা কোনো জবাব ছিল না।

বেনাপোল বন্দর ও ইলিশ
বেনাপোল যশোর জেলার শার্শা উপজেলার একটি শহর। এখানে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর অবস্থিত, আর সীমান্তের ওপারে রয়েছে ভারতের পেট্রাপোল শুল্ক স্টেশন। কলকাতার কাছাকাছি হওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলপথের বাণিজ্যে বন্দরটির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি; ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের বড় অংশ এই পথেই দেশে ঢোকে।
ইলিশ (Tenualosa ilisha) বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেরও রাজ্য-মাছ। বাংলার দুই পাশেই এ মাছের চাহিদা অনেক এবং দামও অন্য মাছের চেয়ে বেশি। কাস্টমস কর্মকর্তাদের বর্ণনায়, উচ্চমূল্যের এই মাছকে কম শুল্কের মিঠাপানির মাছ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে খালাসের চেষ্টা হয়েছিল বলেই চালানটি জব্দ করা হয়।

ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি অবজারভার, উইকিপিডিয়া (বেনাপোল, ইলিশ)





মন্তব্য
(০)