২০২৫ সালের ২ জুন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এ পেঁপে গাছের ফলন বাড়ানোর উপায় নিয়ে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। লেখক কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাস। তাঁর মূল কথা ছিল সহজ: পেঁপে পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফল, দেশের কৃষি ও পুষ্টি নিরাপত্তায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বাংলাদেশে উৎপাদিত পেঁপে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ আছে, আর গাছের স্বাস্থ্য ও ফলনের জন্য বিশেষ করে তিনটি পুষ্টি উপাদান, জিংক, বোরন ও ম্যাগনেসিয়াম, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সতর্কও করেছিলেন, সঠিক পরিমাণ না জেনে এগুলো প্রয়োগ করলে গাছের ক্ষতি হতে পারে।
এই প্রতিবেদনে লেখাটির মূল বিষয় অক্ষুণ্ণ রেখে তাঁর পরামর্শ মিলিয়ে দেখা হয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানের সুপারিশের সঙ্গে, যারা পেঁপে চাষের নির্দেশনা প্রকাশ করে: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), যাদের বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস) পোর্টালে পেঁপে চাষের একটি নির্দেশিকা আছে; মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই); যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই, ভারতের তামিলনাড়ু ও কেরালার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও সম্প্রসারণ বিভাগ; এবং পিয়ার-রিভিউড গবেষণা। মূল লেখায় প্রতিটি উপাদানের জন্য গাছপ্রতি নিজস্ব মাত্রা দেওয়া হয়েছিল। অনলাইন ডেস্ক সেই সংখ্যাগুলো ডিএই বা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) প্রকাশিত কোনো সুপারিশে খুঁজে পায়নি, তাই সেগুলো এখানে পুনরাবৃত্তি করা হয়নি; নিচে যে মাত্রাগুলো আছে, সেগুলো নাম উল্লেখ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের প্রকাশিত সুপারিশ।
২০২৫ সালের জুনের লেখায় যা বলা হয়েছিল
সমীরণ বিশ্বাস প্রতিটি উপাদানের কাজ সহজ ভাষায় বুঝিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, জিংক পাতা হলুদ হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে এবং গাছের বৃদ্ধি স্বাভাবিক রাখে। বোরন ফল ফেটে যাওয়া ও বিকৃত ফল হওয়া রোধ করে। ম্যাগনেসিয়াম পাতা হলুদ হওয়ার সমস্যা, অর্থাৎ ক্লোরোসিস দূর করে। তিনি পরামর্শ দেন, জিংক ও বোরন দিতে হবে ফুল ফোটার আগে ও ফল ধরার সময়, ম্যাগনেসিয়াম মাটিতে দিতে হবে বর্ষা বা সেচের পরে, আর স্প্রে করতে হবে সকালে বা বিকেলে, কড়া রোদে নয়।
তাঁর সতর্কবার্তা ছিল, এর যেকোনোটিই অতিরিক্ত দিলে গাছের ক্ষতি হতে পারে, বিশেষ করে বোরন বেশি দিলে বিষাক্ততা দেখা দেয়, তাই নির্ধারিত পরিমাণের বেশি কখনো দেওয়া উচিত নয়। লেখার শেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষকদের পেঁপে চাষে অপার সম্ভাবনা আছে, পেঁপের পাতা ও কাঁচা ফল ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত হয়, এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করা গেলে এই ফসল কৃষি অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি এ-ও লিখেছিলেন যে ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসায় পেঁপে পাতা কার্যকর ভূমিকা রাখে; এই দাবিটি চিকিৎসা-গবেষণার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে এই প্রতিবেদনের শেষ অংশে দেখা হয়েছে।
বাংলাদেশে পেঁপে
পেঁপে (Carica papaya) ক্যারিকেসি (Caricaceae) গোত্রের নরম কাণ্ডবিশিষ্ট, সাধারণত শাখাহীন গাছ, যার আগায় থাকে লম্বা বোঁটায় করতলের মতো খণ্ডিত বড় বড় পাতার গুচ্ছ। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, প্রজাতিটির আদি নিবাস মধ্য আমেরিকা, আর ষোড়শ শতকের শেষার্ধে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছায়। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে উৎপাদিত পেঁপের ৬০ শতাংশের বেশি পাকা ফল হিসেবে নয়, কাঁচা অবস্থায় সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, এবং বসতবাড়িতেও এ গাছ ব্যাপকভাবে লাগানো হয়।
পেঁপে মূলত একলিঙ্গী উদ্ভিদ: পুরুষ ফুল ও স্ত্রী ফুল সাধারণত আলাদা গাছে ধরে, যদিও দুই ধরনের ফুলই ধরে এমন মধ্যবর্তী গাছও দেখা যায়। বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে, অল্পবয়সী চারা দেখে পুরুষ না স্ত্রী গাছ তা চেনার নির্ভরযোগ্য উপায় না থাকায় যথেষ্ট স্ত্রী গাছ নিশ্চিত করতে কৃষকেরা প্রতিটি গর্তে দুই-তিনটি করে চারা লাগিয়ে থাকেন।
লেখাটি প্রকাশের আগের বছরগুলোতে বাণিজ্যিক পেঁপে চাষ দ্রুত বেড়েছে। ২০২০ সালের অক্টোবরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে পেঁপে উৎপাদন হয়েছিল ৪ লাখ ৯২ হাজার টন, আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় প্রায় ৯ লাখ টনে, অর্থাৎ পাঁচ বছরে প্রায় দ্বিগুণ। ডিএই কর্মকর্তারা পত্রিকাটিকে বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি পেঁপে উৎপাদিত হয় টাঙ্গাইলে, বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন; এরপর বান্দরবান, বছরে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টন; আর কমবেশি পেঁপে চাষ হয় দেশের সব জায়গায়।
একই প্রতিবেদনে বেশির ভাগ কৃষকের চাষ করা দুটি জাতের কথা বলা হয়: বারির উদ্ভাবিত শাহী পেঁপে, যার একেকটি ফলের ওজন ৮৫০ গ্রাম থেকে ১ কেজি; এবং আমদানি করা রেড লেডি, যার ফলের ওজন দেড় থেকে ২ কেজি এবং যার বীজ প্রথমে শুধু তাইওয়ান থেকে আসত, পরে চীন থেকেও আমদানি শুরু হয়। ডিএইর উদ্যানতত্ত্ব উইংয়ের একজন কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, আগে মানুষ পরিবারের প্রয়োজনে বাড়ির আঙিনায় পেঁপের চারা লাগাত, এখন বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষ বাড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শে পেঁপের চাষ ও সার
বামিস পোর্টালে ডিএইর পেঁপে নির্দেশিকায় উন্নত জাত হিসেবে বারি পেঁপে-১, রেড লেডিসহ কয়েকটি জাতের নাম আছে, আর বীজ বপনের দুটি মৌসুম বলা হয়েছে: আশ্বিন (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) এবং পৌষ (ডিসেম্বর-জানুয়ারি)। নির্দেশিকায় পলিথিন ব্যাগে চারা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এভাবে তৈরি চারা রোপণের পর দ্রুত বাড়ে। প্রায় ৫ বাই ৪ ইঞ্চি মাপের ব্যাগে সমান পরিমাণ বালু, মাটি ও পচা গোবরের মিশ্রণ ভরে ব্যাগের তলায় দুই-তিনটি ছিদ্র করে দিতে হয়।
সারের জন্য নির্দেশিকার সারণিতে আছে ইউরিয়া ৪০০-৫০০ গ্রাম, টিএসপি ৫০০ গ্রাম, এমওপি (মিউরিয়েট অব পটাশ) ৪৫০-৫০০ গ্রাম, জিপসাম ২৫০ গ্রাম, জিংক ২০ গ্রাম এবং বোরন ২০ গ্রাম। সার প্রয়োগের পদ্ধতি অংশে বলা হয়েছে:
- চারা রোপণের ১৫-২০ দিন আগে প্রতি গর্তে ১৫ কেজি গোবর সারের সঙ্গে টিএসপি, জিপসাম, জিংক সালফেট ও বোরিক এসিড দিতে হবে।
- চারা রোপণের এক মাস পর থেকে প্রতি মাসে একবার ইউরিয়া ও এমওপি উপরি প্রয়োগ করতে হবে, প্রতি গাছে ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০ গ্রাম এমওপি।
- গাছে ফুল এলে এই মাসিক মাত্রা দ্বিগুণ করতে হবে।
- ফল তোলার দুই মাস আগে সার দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
নির্দেশিকায় আরও সতর্ক করা হয়েছে, অতিরিক্ত সেচ গোড়া পচা রোগের অনুকূল; বৃষ্টি বা সেচের পানি জমিতে জমতে দেওয়া যাবে না, আর অতিবৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে গেলে দ্রুত সরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রবি মৌসুমে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রা থেকে চারা রক্ষায় বীজতলা ঢেকে রাখতে বলা হয়েছে। জাতভেদে ফলন ধরা হয়েছে শতকপ্রতি ১৪০-১৫০ কেজি।
অর্থাৎ ডিএইর নিজস্ব সূচিতেই রোপণের সময় জিংক সালফেট ও বোরিক এসিড আকারে জিংক ও বোরন দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। ম্যাগনেসিয়াম সেই সারণিতে নেই। কোনো নির্দিষ্ট বাগানে এই তিনটির কোনোটি বাড়তি লাগবে কি না, তা নির্ভর করে সেই জমির মাটির ওপর। এ কারণেই এই প্রতিবেদনের জন্য যত প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ দেখা হয়েছে, সবাই বাড়তি সার দেওয়ার আগে মাটি পরীক্ষা করানো এবং উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছে।
জিংক: কেন বাংলাদেশের মাটিতে প্রায়ই ঘাটতি থাকে
বাংলাদেশে জিংকের ঘাটতি একটি পরিচিত সমস্যা। বাংলাপিডিয়ার মৃত্তিকা পুষ্টি বিষয়ক ভুক্তি অনুযায়ী, জিংকের ঘাটতি দেখা গেছে গঙ্গা প্লাবনভূমির চুনযুক্ত মাটিতে, সেচ এলাকার সারা বছর ভেজা থাকা মাটিতে, পিট মাটির মতো বেশি জৈব পদার্থযুক্ত মাটিতে, উচ্চ পিএইচের লবণাক্ত মাটিতে এবং হালকা রঙের পাদদেশীয় সমভূমির মাটিতে।
সমস্যাটি বিস্তৃত হয়েছে। এফএওর গ্লোবাল সিম্পোজিয়াম অন সয়েলস ফর নিউট্রিশনে উপস্থাপিত এক গবেষণায় এসআরডিআইয়ের তথ্য (হাসান ও অন্যান্য, ২০২০) উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আবাদি জমির যে অংশে জিংকের মাত্রা কম থেকে খুব কম, তা ২৮.৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৮.৮৪ শতাংশ হয়েছে; আর বোরনের মাত্রা কম থেকে খুব কম এমন জমির অংশ ২৫.৯৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০.৭৮ শতাংশ হয়েছে। চান্দিনা, চুয়াডাঙ্গা ও বালিয়াডাঙ্গীতে চালানো একই গবেষণায় দেখা যায়, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের সুপারিশকৃত মাত্রার সঙ্গে পাতায় জিংক ও বোরন স্প্রে করলে ধান, ফুলকপি, ভুট্টা, আলু ও মুগডালের ফলন কেবল রোপণের সময় মাটিতে জিংক দেওয়ার চেয়ে বেশি হয়।
পেঁপের ক্ষেত্রে ডিএইর নির্দেশিকায় মৌল মাত্রা হলো প্রতি গর্তে ২০ গ্রাম জিংক সালফেট। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অ্যাগ্রিটেক পোর্টালে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন বাড়াতে রোপণের পর চতুর্থ ও অষ্টম মাসে ০.৫ শতাংশ জিংক সালফেটের সঙ্গে ০.১ শতাংশ বোরিক এসিড মিশিয়ে পাতায় স্প্রে করার সুপারিশ করে। এটি ভারতের পরিস্থিতির জন্য ভারতীয় সুপারিশ, বিশ্ববিদ্যালয়টি যেভাবে বলেছে সেভাবেই এখানে দেওয়া হলো; বাংলাদেশের কৃষকের উচিত স্প্রের সূচি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে নিশ্চিত করে নেওয়া।
বোরন: বিকৃত ফল আর মাত্রা ছাড়ানোর ঝুঁকি
পেঁপেচাষিরা যে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি টের পান, তা বোরন, কারণ এর প্রভাব সরাসরি ফলে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন সায়েন্সেস বিভাগের স্কট নেলসনের লেখা এবং ২০১২ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত পেঁপের বোরন ঘাটতি বিষয়ক সম্প্রসারণ নির্দেশিকা ব্যাখ্যা করে, নাইট্রোজেন বিপাক, আমিষ গঠন, কোষ বিভাজন ও কোষপ্রাচীর গঠনে বোরনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, আর পরাগায়ন ও বীজ উৎপাদনের জন্যও এটি অপরিহার্য। বোরন গাছের ভেতরে সহজে চলাচল করে না বলে এর ঘাটতির প্রথম লক্ষণ দেখা যায় গাছের ডগায় এবং ফলে।
হাওয়াইয়ের নির্দেশিকা অনুযায়ী, বোরনের ঘাটতিতে কচি পাতা বিকৃত, ভঙ্গুর ও নখের মতো বাঁকানো হয়ে যায়, পরিণত গাছ খর্বাকৃতি হয় এবং ফল ধরা অনেক কমে যায়। আক্রান্ত ফল প্রায়ই বীজহীন, অপুষ্ট, অসমভাবে পাকে এবং মিষ্টতা কম থাকে; কচি ফল থেকে কষ বের হতে পারে, আর তীব্র আক্রান্ত গাছে ফলের গায়ে গুটি গুটি উঁচু দাগ হয়ে যেতে পারে। নির্দেশিকায় উল্লেখ আছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে হাওয়াইয়ের কৃষকেরা অতীতে এই ঘাটতির কারণে প্রায় শতভাগ ফসল হারিয়েছেন। এতে আরও বলা হয়েছে, বেশি বৃষ্টিতে বেলে ও পাথুরে মাটি থেকে বোরন ধুয়ে যায়, আর শুকনো বা উচ্চ পিএইচের মাটিতে বোরন শক্তভাবে আটকে থাকে, তাই খুব ভেজা বা খুব শুষ্ক এলাকায় এই ঘাটতি বেশি দেখা যায়।
একই নির্দেশিকা সেই বিপদের ওপর জোর দিয়েছে, যার কথা জাগো নিউজের লেখাতেও ছিল: অতিরিক্ত বোরন গাছের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, এমনকি গাছ মেরে ফেলতে পারে, আবার খুব কম দিলে ঘাটতি দূর হয় না। এর সাধারণ নির্দেশনাগুলো হলো:
- বছরে অন্তত দুবার পেঁপের জন্য তৈরি এমন সার দিন, যাতে বোরনসহ অণুপুষ্টি উপাদানগুলো আছে।
- ঘাটতি দূর করতে ০.২৫ শতাংশ বোরাক্স বা বোরিক এসিডের দ্রবণ পাতায় স্প্রে করুন অথবা মাটিতে ঢেলে দিন; ঘাটতি দূর হলে প্রায় তিন মাস পরে ফল স্বাভাবিকভাবে বাড়বে।
- বিকল্প হিসেবে গাছের গোড়ার চারপাশে ০.৫ গ্রাম বোরাক্স দিন; তাতে কাজ না হলে গাছপ্রতি সর্বোচ্চ ৫ গ্রাম পর্যন্ত বোরাক্স দেওয়া যেতে পারে।
- যে গাছে বোরন দেওয়া হয়েছে, তাতে অন্তত তিন মাস আবার বোরন দেবেন না, কারণ ফল বুঝতে এই সময় লাগে।
- দানাদার বা গুঁড়া বোরন দেওয়ার পর সেচ দিন, যাতে শিকড় তা গ্রহণ করতে পারে।
ভারতের কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেঁপে বিষয়ক পাতায়ও প্রায় একই পরামর্শ আছে: মাটি পরীক্ষা করে ঘাটতি নিশ্চিত হয়ে মাটিতে গাছপ্রতি ৪ গ্রাম বোরাক্স দিতে হবে, অথবা প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম বোরাক্স মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি বোরন ও ক্যালসিয়াম একসঙ্গে প্রয়োগ না করতে এবং অ্যামোনিয়াম সারের সঙ্গে বোরাক্স না মেশাতে বলেছে। এসব সংখ্যা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব এবং একটির সঙ্গে আরেকটির পার্থক্য আছে; নির্দিষ্ট কোনো সূত্র ধরে নয়, বরং ডিএইর রোপণকালীন মাত্রা ও মাটি পরীক্ষার ফল থেকে শুরু করার এটি আরেকটি কারণ।

ম্যাগনেসিয়াম: নিচের পাতা থেকে শুরু হওয়া হলুদ ভাব
ম্যাগনেসিয়াম একটি গৌণ পুষ্টি উপাদান, যা জিংক বা বোরনের চেয়ে বেশি পরিমাণে লাগে। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চল, মধুপুর গড় এবং অম্লীয় সালফেট মাটিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি আছে।
কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পেঁপেতে এর লক্ষণ বর্ণনা করেছে এভাবে: ঘাটতি প্রথমে দেখা যায় নিচের দিকের পাতায়, শিরার মাঝখানের অংশ হলুদ হয়ে যায়, আর পাতার কিনারা ঘিরে থাকে সবুজ বলয়; পরে কিনারার হলুদ ভাব মধ্যশিরার দিকে এগোয়, গাছের উচ্চতা অনেক কমে যায়, পাতা বিকৃত হয় এবং পাতার বোঁটায় বেগুনি ছোপ দেখা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শ হলো, মাটি পরীক্ষা করে ঘাটতি নিশ্চিত হয়ে গাছের কাছে সারি করে গাছপ্রতি ৩২ গ্রাম ম্যাগনেসিয়াম সালফেট প্রয়োগ করা। এতে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে ডলোমাইট ব্যবহার করলে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি কমে, এবং ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশ সার একসঙ্গে প্রয়োগ করা উচিত নয়।
তবে পাতা হলুদ হওয়া মানেই ম্যাগনেসিয়ামের অভাব নয়। কেরালার ওই পাতায় পেঁপের পাতা ফ্যাকাশে বা হলুদ হওয়ার কারণ হিসেবে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, সালফার ও ক্যালসিয়ামের ঘাটতির কথাও আছে, প্রতিটির লক্ষণ আলাদা ধরনের। ভাইরাসেও পাতা হলুদ ও ছোপ ছোপ হয়, পরের অংশে যার ব্যাখ্যা আছে, আর ভাইরাসজনিত রোগ সার দিয়ে সারানো যায় না।
পাতা হলুদ মানে যখন ভাইরাস: পেঁপের রিংস্পট
পেঁপের রিংস্পট ভাইরাস (পিআরএসভি) পেঁপের সবচেয়ে মারাত্মক রোগগুলোর একটি। বাংলাদেশে এর উপস্থিতির কথা প্রথম জানানো হয় ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্ল্যান্ট ডিজিজ সাময়িকীতে, ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের প্রতিবেদনে। ২০০৩ সালের এপ্রিল থেকে জুনে ঢাকা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে জরিপ চালিয়ে তাঁরা দেখতে পান, অর্ধেকের বেশি পেঁপে গাছের পাতায় ছোপ, মোজাইক ও হালকা বিকৃতি এবং পাতার বোঁটা ও কাণ্ডে পানিভেজা দাগ রয়েছে। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি, রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন পিসিআর ও জিন বিন্যাস বিশ্লেষণে পিআরএসভি নিশ্চিত হয়; বাংলাদেশি নমুনার কোট প্রোটিনের সঙ্গে ভারতীয় নমুনাগুলোর মিল ছিল ৮৯ থেকে ৯২ শতাংশ।
২০০২ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই অঙ্গরাজ্যের কৃষি বিভাগের জারি করা এক বালাই সতর্কবার্তায় রোগটির লক্ষণ বলা হয়েছে: গাছের মাথা হলুদ ও খর্ব হয়ে যাওয়া, পাতায় ছোপ, কচি পাতা সরু ফিতার মতো ("শু-স্ট্রিং") হয়ে যাওয়া, পাতার বোঁটায় পানিভেজা দাগ এবং ফলের গায়ে ছোট ছোট গাঢ় রঙের বলয়। পাতার আচ্ছাদন কমতে থাকায় ফলন, ফলের আকার ও মান কমে যায়। ভাইরাসটি ছড়ায় জাবপোকার মাধ্যমে, বিশেষ করে গ্রিন পিচ এফিড ও মেলন এফিড; এটি অস্থায়ী (নন-পারসিস্টেন্ট) ধরনে ছড়ায়, অর্থাৎ ভাইরাস জাবপোকার শরীরে বংশবৃদ্ধি করে না, পোকা খাওয়ার সময় এর মুখাংশে লেগে থেকে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যায়। আক্রান্ত চারা লাগালেও নতুন এলাকায় রোগ ছড়ায়।
সতর্কবার্তায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, আক্রান্ত গাছের কোনো প্রতিকার নেই; এমন গাছ কেটে নষ্ট করে ফেলতে হবে। আশপাশে শসা বা বাঁধাকপির মতো ফসল না লাগাতেও বলা হয়েছে, কারণ এগুলোতে জাবপোকা আশ্রয় নেয়। তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাহক পোকা ঠেকাতে চারপাশে ভুট্টা লাগানোর পরামর্শ দেয়। ডিএইর বামিস নির্দেশিকায় মোজাইক ও পাতা কোঁকড়ানো রোগের বাহক জাবপোকা দমনে ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের কীটনাশক ১০ লিটার পানিতে ৭-১০ মিলিলিটার মিশিয়ে ১০ দিন পরপর দুই-তিনবার স্প্রে করার সুপারিশ আছে, সঙ্গে আছে প্রতিটি বালাইনাশকের জন্য নিরাপত্তা নিয়ম: বোতল বা প্যাকেটের লেবেল ভালো করে পড়ে নির্দেশনা মেনে চলা, ব্যবহারের সময় নিরাপত্তা পোশাক পরা, স্প্রে করার সময় ধূমপান ও পানাহার না করা, স্প্রের পানি যেন মুক্ত জলাশয়ে না মেশে তা খেয়াল রাখা, এবং বালাইনাশক দেওয়া জমির ফসল অন্তত সাত থেকে ১৫ দিন পরে বাজারে তোলা।

পুষ্টিগুণ, প্যাপেইন ও ডেঙ্গু নিয়ে দাবি
পুষ্টিগুণ নিয়ে লেখাটির বক্তব্য তথ্যে টেকে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা (রান্না না করা) পেঁপেতে আছে ৮৮.০৬ গ্রাম পানি, ৪৩ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ১০.৮২ গ্রাম শর্করা, ১.৭ গ্রাম খাদ্য আঁশ, ৬০.৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৪৭ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ (রেটিনল কার্যকারিতা সমতুল্য হিসেবে), ২৭৪ মাইক্রোগ্রাম বিটা-ক্যারোটিন, ৩৭ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট এবং ১৮২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম।
পেঁপের কষে থাকে প্যাপেইন নামের উৎসেচক, বাংলাপিডিয়া যাকে পেপসিনসদৃশ ও হজমে সহায়ক বলে বর্ণনা করেছে। তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর শিল্প-ব্যবহারের তালিকা দিয়েছে: বিয়ার তৈরির শিল্পে, মাংস নরম করার উপকরণ হিসেবে, বস্ত্র ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে এবং ওষুধে। বিশ্ববিদ্যালয়টি জানায়, ৭৫ থেকে ৯০ দিন বয়সী কাঁচা ফল থেকে কষ সংগ্রহ করা হয়, আর তাদের উদ্ভাবিত সিও ২ ও সিও ৫ জাত প্যাপেইন উৎপাদনের জন্য তৈরি।
ডেঙ্গুর চিকিৎসায় পেঁপে পাতার দাবিটি বেশি সাবধানে দেখা দরকার। ২০১৯ সালের অক্টোবরে বিএমসি কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিন সাময়িকীতে শ্রীলঙ্কার কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে নয়টি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা বিশ্লেষণ করা হয়, যার ছয়টি ভারতের। সাতটিতে পেঁপের নির্যাস পাওয়া রোগীদের প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকার সংখ্যা বেড়েছিল, আর সম্মিলিত তথ্যে হাসপাতালে থাকার সময় কিছুটা কম দেখা যায়, কিন্তু প্রমাণের মান ছিল নিম্ন। গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, বর্তমান প্রমাণ যথেষ্ট নয়, এবং ডেঙ্গুর চিকিৎসায় নিয়মিতভাবে পেঁপের নির্যাস ব্যবহারের সুপারিশ করা যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, আর দ্রুত রোগ শনাক্ত করা ও যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাওয়া গেলে গুরুতর ডেঙ্গুতে মৃত্যু অনেক কমে। ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে; চিকিৎসার বদলে পেঁপে পাতার ওপর ভরসা করা ঠিক নয়।

ছবি: Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিস পোর্টাল), বাংলাপিডিয়া, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, এফএও গ্লোবাল সিম্পোজিয়াম অন সয়েলস ফর নিউট্রিশন, হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব ট্রপিক্যাল অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্সেস, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, প্ল্যান্ট ডিজিজ (আমেরিকান ফাইটোপ্যাথলজিক্যাল সোসাইটি), হাওয়াই কৃষি বিভাগ, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, বিএমসি কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড অল্টারনেটিভ মেডিসিন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা





মন্তব্য
(০)