২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি, দেশের আলুর মাঠগুলো যখন তোলার মৌসুমের কাছাকাছি, তখন জাগো নিউজ ২৪ আলু কখন ও কীভাবে তুলতে হয় তা নিয়ে একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকা প্রকাশ করে। এর মূল পরামর্শ ছিল, জাতভেদে আলু রোপণের সাধারণত ৮৫ থেকে ৯৫ দিন বা ১০০ থেকে ১২০ দিন পর, সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে, আলু তোলার উপযুক্ত সময় হয়; তবে আগাম জাতের আলু ৭০ থেকে ৮০ দিনেই তোলা যায়। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়, গাছ মরে যাওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরে মাটি শুকনা থাকা অবস্থায় রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে আলু তুললে খোসা শক্ত হয় এবং আলু দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা যায়। এই প্রতিবেদনে সেই পরামর্শগুলো তুলে ধরা হলো, পাশাপাশি আলু তোলা, খোসা শক্ত হওয়া, নাড়াচাড়া ও সংরক্ষণ নিয়ে তখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্র (সিআইপি), বাংলাপিডিয়া এবং অন্যান্য গবেষণা ও সম্প্রসারণ সূত্র যা প্রকাশ করেছিল, তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলো।
বাংলাদেশে আলুর মৌসুম
বাংলাদেশে আলু শীতকালীন ফসল। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, শীতকালে দেশের সব জেলাতেই ব্যাপকভাবে আলুর চাষ হয়, আর রোপণের উপযুক্ত সময় নভেম্বরের প্রথম পক্ষকাল। কিছু এলাকায় কৃষকেরা আগাম ফসল তোলার জন্য অক্টোবরেই আলু লাগান। একই ভুক্তি অনুযায়ী, দেশে বেশির ভাগ জাতের আলু তোলা হয় ফেব্রুয়ারি ও মার্চে, আর সাধারণত কোদাল বা এ জাতীয় উপকরণ দিয়ে হাতেই আলু সংগ্রহ করা হয়।
অন্যান্য সূত্রেও প্রায় একই সময়সূচি পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের জুনে চীনের কুনমিংয়ে আলু উৎপাদন যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এক কর্মশালায় বারির ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ যে দেশভিত্তিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করে, তাতে বাংলাদেশে আলুর মৌসুম বলা হয়েছে মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য মার্চ, গড় তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর ধান-আলু-ভুট্টা ফসলধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে আলুর বাজার নিয়ে এক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছিল, সাধারণত অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যে আলু রোপণ করা হয় এবং তোলা হয় ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে।
ফলে নির্দেশিকায় বলা জানুয়ারি থেকে মার্চের সময়টি দেশের সাধারণ চিত্রের সঙ্গেই মেলে: আগাম রোপণ ও আগাম জাতের আলু আগে ওঠে, আর বেশির ভাগ ফসল তোলা হয় ফেব্রুয়ারি ও মার্চে। যেহেতু এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, এমনকি পাশাপাশি দুই জমিতেও রোপণের তারিখ কয়েক সপ্তাহ এদিক-ওদিক হয়, তাই কোনো নির্দিষ্ট জমির জন্য ক্যালেন্ডারের মাসের চেয়ে রোপণের পর কত দিন গেল, সেই হিসাবটিই বেশি কাজের।
আলু কীভাবে তোলা ও নাড়াচাড়া করা হয়, তা যাঁরা আলু খান তাঁদের জন্যও কেন গুরুত্বপূর্ণ, বাংলাপিডিয়া তা-ও ব্যাখ্যা করে। আলুতে প্রচুর শর্করা বা শ্বেতসার থাকে, আর এটি আমিষ, ভিটামিন সি, বি-ভিটামিন, পটাশিয়াম, ফসফরাস ও লৌহের ভালো উৎস। জ্ঞানকোষটি জানায়, আলুর বেশির ভাগ খনিজ ও আমিষ খোসার ঠিক নিচের একটি পাতলা স্তরে জমা থাকে, আর খোসা নিজেও খাদ্য-আঁশের উৎস। তাই জমিতে যে আলু কেটে যায়, খোসা উঠে যায় বা থেঁতলে যায়, তার সংরক্ষণকালের সঙ্গে সঙ্গে মানও কমে।

ফসল তোলার উপযুক্ত হয়েছে কি না, বোঝার উপায়
জাগো নিউজের নির্দেশিকায় প্রথম লক্ষণ হিসেবে গাছের অবস্থার কথা বলা হয়। আলুর গাছ পুরোপুরি মরে গিয়ে হলুদ বা বাদামি হয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেলে বুঝতে হবে, আলু তোলার সময় হয়েছে। বাংলাপিডিয়াও একই প্রক্রিয়ার বর্ণনা দেয়: গাছ পরিপক্ব হলে এবং আলু পুরোপুরি গঠিত হলে পাতা ধীরে ধীরে হলদেটে, পরে বাদামি হয়ে যায় এবং শেষে গাছ মরে যায়। জ্ঞানকোষটির ভাষায়, জমিতে এসব লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার পর ফসল তোলাই সবসময় ভালো।
পরিপক্ব হতে কত দিন লাগবে, তা জাতের ওপর নির্ভর করে। নির্দেশিকার হিসাবে কোনো কোনো জাতের জন্য তা ৮৫ থেকে ৯৫ দিন, কোনোটির জন্য ১০০ থেকে ১২০ দিন, আর আগাম জাত ৭০ থেকে ৮০ দিনেই তৈরি হয়। এক জেলায় অক্টোবরে আর আরেক জেলায় নভেম্বরের শেষে আলু লাগানো হতে পারে বলে কৃষকের উচিত নির্দিষ্ট কোনো তারিখের অপেক্ষা না করে নিজের জমির রোপণের দিন থেকে গুনে তারপর গাছের অবস্থা দেখা।
গাছ মরে যাওয়া প্রক্রিয়ার শুরু, শেষ নয়। নির্দেশিকা গাছ মরে যাওয়ার পর দুই থেকে তিন সপ্তাহ অপেক্ষা করে আলু তোলার পরামর্শ দেয়, কারণ এই সময়ে আলুর খোসা শক্ত হয়, যা সংরক্ষণের জন্য জরুরি। আলু ও অন্যান্য মূল ও কন্দজাতীয় ফসল নিয়ে কাজ করা সিজিআইএআর গবেষণা কেন্দ্র সিআইপি পি. ওয়াটার্স ও এম. পার্কারের তৈরি ২০২০ সালের একটি পোস্টারে (আলুর রুটেড অ্যাপিক্যাল কাটিং নিয়ে ভালো চর্চার নির্দেশিকা) মাঠে পরীক্ষার একটি সহজ উপায় দিয়েছে: বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর মাঝে আলু ঘষলে খোসা যদি সহজে সরে না যায়, তবে খোসা শক্ত হয়েছে। কয়েকটি গাছ খুঁড়ে এভাবে আলু ঘষে দেখলেই বোঝা যায়, জমির বাকি অংশ তোলার উপযুক্ত হয়েছে কি না।

সংরক্ষণের জন্য শক্ত খোসা কেন জরুরি
সদ্য গঠিত আলুর খোসা পাতলা; এ থেকে সহজে পানি বেরিয়ে যায় এবং হালকা চাপেই খোসা ছড়ে যায়। এ নিয়ে গবেষণা কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৮২ সালে কানাডিয়ান অ্যাগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে কানাডার নিউ ব্রান্সউইকের ফ্রেডেরিকটনে অ্যাগ্রিকালচার কানাডার গবেষণা কেন্দ্রের জি. সি. মিসেনার লেখেন, পুরো সংরক্ষণকালে আর্দ্রতা হারিয়ে আলুর যে ওজন কমে, তার বড় অংশই কমে আলু তোলার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে, এমনকি প্রথম কয়েক দিনে। এর কারণ হিসেবে তিনি পাতলা ও পানি-ভেদ্য খোসা এবং আলু তোলা ও পরিবহনের সময় হওয়া কাটা ও থেঁতলানোর কথা বলেন। একই গবেষণাপত্রে বলা হয়, আলু তোলার সময় তা কতটা সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নির্ভর করে আলু কতটা পরিপক্ব তার ওপর।
জাগো নিউজের নির্দেশিকায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ অপেক্ষার পরামর্শের পেছনে এটাই যুক্তি। গাছ মরে যাওয়ার পর যে আলু মাটিতে থেকে যায়, খোসা মোটা ও শক্ত হওয়ার সময়টায় মাটিই তাকে সুরক্ষা দেয়। বীজ আলুর জন্য সিআইপির পোস্টারেও একই ধরনের ব্যবধানের কথা আছে: গাছের মাটির ওপরের অংশ নষ্ট করার পর আলু তোলার আগে ১০ থেকে ১৪ দিন আলু মাটিতে রেখে দিতে হবে, যাতে ভালো সংরক্ষণ, পরিবহন এবং সংগ্রহোত্তর রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য খোসা শক্ত হয়।
শক্ত খোসা আলু তোলার সময় অনিবার্যভাবে হওয়া ছোটখাটো ক্ষত সারাতেও সাহায্য করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির সবজি নির্দেশিকা কিউরিংকে কাটা ও থেঁতলানো জায়গা সেরে ওঠার প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করে। এতে বলা হয়, উচ্চ আর্দ্রতা (প্রায় ৯৫ শতাংশ), ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা এবং ভালো বায়ু চলাচল থাকলে সংরক্ষণাগারে কিউরিং সবচেয়ে দ্রুত হয়, আর ক্ষতস্থানে সুরক্ষা-স্তর তৈরির জন্য সংরক্ষণের শুরুতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ এই অবস্থা বজায় রাখা উচিত। এমন নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ কৃষকের বাড়িতে নয়, বাণিজ্যিক সংরক্ষণাগারে পাওয়া যায়; তবে নীতিটি সব কৃষকের জন্যই এক: তোলার সময় আলুতে যত কম ক্ষত হবে, তত কম সারানোর প্রয়োজন পড়বে।
আলু তোলার আগে গাছের ওপরের অংশ কাটা বা উপড়ানো
নির্দেশিকার শেষ লক্ষণটি প্রাকৃতিক নয়, একটি ব্যবহারিক পদক্ষেপ। আলু তোলার ৭ থেকে ১০ দিন আগে মাটির ওপরের গাছের অংশ (হাম) কেটে ফেললে আলুর চামড়া শক্ত হয়, বলা হয় নির্দেশিকায়। এভাবে হাম সরালে আলুর বৃদ্ধি থেমে যায় এবং গাছ নিজে থেকে মরার অপেক্ষা না করে কৃষকের বেছে নেওয়া দিনেই খোসা শক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মিসেনারের ১৯৮২ সালের গবেষণাপত্রে আলু তোলার আগে চাষিরা কেন হাম মেরে ফেলেন বা সরিয়ে দেন, তার কারণগুলো দেওয়া আছে: এতে লতাপাতার পরিমাণ কমে এবং আলু তোলা সহজ হয়, লেট ব্লাইটজনিত কন্দপচা থেকে ক্ষতি কমে, জাবপোকাবাহিত লিফ রোল ভাইরাসের মতো রোগের বিস্তার কমে, আলুর আকার নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এবং তোলার সময় খোসা ওঠা ও অন্যান্য ক্ষতি কমে। দুটি জাতের বীজ আলু নিয়ে তাঁর তিন বছরের গবেষণায় হাম মারা ও আলু তোলার মধ্যবর্তী সময়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়। রাসায়নিক ও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণকালীন ওজন হ্রাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হাম মারা ও আলু তোলার মধ্যে দুই থেকে আড়াই সপ্তাহের ব্যবধান দরকার হয়েছিল, আর পরীক্ষিত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সংরক্ষণকালীন ওজন হ্রাসের বিচারে গাছ উপড়ে ফেলাই সবচেয়ে কার্যকর মনে হয়েছিল।
বাংলাদেশে বীজ আলুর ফসলে হাম সরানোর সময় নিয়ে গাজীপুরের জয়দেবপুরে বারির কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেছেন। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এ. এ. মাহমুদ ও তাঁর সহকর্মীরা ১৯৯৬-৯৭ ও ১৯৯৭-৯৮ মৌসুমে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের বীজ আলু উৎপাদন খামারে কার্ডিনাল, মুল্টা, এইলসা, হীরা ও ধীরা, এই পাঁচ জাত নিয়ে পরীক্ষার ফল জানান। রোপণের ৭০ দিন পর হাম সরালে বীজ-আকারের আলু সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, হেক্টরপ্রতি ১৯.৭৫ টন, যা পরিসংখ্যানগতভাবে ৭৫ দিনে (হেক্টরপ্রতি ১৯.৫৬ টন) ও ৮০ দিনে (হেক্টরপ্রতি ১৮.৬৯ টন) হাম সরানোর ফলের সমান। সবচেয়ে কম বীজ আলু পাওয়া যায় ৬৫ দিনে হাম সরালে। জাতগুলোর মধ্যে সার্বিকভাবে হীরা সবচেয়ে ভালো ফল দেয়।
বীজ বর্ধনের জন্য লেখা সিআইপির পোস্টারে বলা হয়েছে, ফসলের অন্তত ৭৫ শতাংশ আলু কাঙ্ক্ষিত আকারে পৌঁছালে হাম নষ্ট করতে হবে; বীজ আলুর ক্ষেত্রে সেই আকার মুরগির ডিমের মতো। পোস্টারে উল্লেখ আছে, হাতে কেটে হাম সরালে পোকামাকড় ও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, আর এর বদলে স্পর্শক আগাছানাশক দিয়ে হাম নষ্ট করার কথা বলা হয়েছে। ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির নির্দেশিকাও সতর্ক করে, রাসায়নিক বা যান্ত্রিক যেভাবেই হোক, খুব দ্রুত লতা শুকিয়ে ফেললে আলুর বোঁটার প্রান্তে রং বদলে যেতে পারে। এই প্রতিবেদনে কোনো রাসায়নিকের নাম বা মাত্রা দেওয়া হলো না: হাম মারতে কোনো রাসায়নিক আদৌ উপযুক্ত কি না, হলে কোনটি এবং কী মাত্রায়, তা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে জেনে নেওয়া উচিত, আর যেকোনো পণ্য ব্যবহার করতে হবে তার লেবেলের নির্দেশনা মেনে।
মাটি, আবহাওয়া ও দিনের সময়
জাগো নিউজের নির্দেশিকা মাটির অবস্থার ওপর জোর দেয়। মাটি শুকনা থাকা অবস্থায় আলু তোলা উচিত, কারণ ভেজা মাটিতে আলু তুললে পচন ধরার ঝুঁকি থাকে। কুয়াশাচ্ছন্ন বা মেঘলা দিনে আলু তুলতে নিষেধ করা হয়, আর রোদ ঝলমলে দিনের সকালকে সবচেয়ে ভালো সময় বলা হয়।
সিআইপির পোস্টারেও কাছাকাছি পরামর্শ আছে। বৃষ্টি না হলে আলু তোলার পরামর্শ দিয়ে বলা হয়েছে, মাটি ভেজা না থাকলে এবং আলুর গায়ে লেগে না থাকলে আলু সরাসরি তুলে নেওয়া যায়। আলুর গায়ে মাটি লেগে থাকলে কয়েক ঘণ্টা আলু মাটির ওপর রেখে দিতে হবে, যাতে মাটি শুকিয়ে ঝরে পড়ে; তারপর সঙ্গে সঙ্গে আলু বাছাই করতে হবে।
আলু তোলার সময়ের তাপমাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ। ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির নির্দেশিকা জানায়, ঠান্ডা আলু তোলার সময় সহজে থেঁতলে যায়, আর আবহাওয়া বুঝে আলু তোলার সময় ঠিক করা উচিত। বাংলাদেশে প্রধান ফসল তোলা হয় ফেব্রুয়ারি ও মার্চে, শীতের শেষে; নির্দেশিকার পরামর্শ অনুযায়ী শুকনা, রোদেলা সকাল বেছে নিলে কুয়াশা বা শিশিরে ভেজা মাটিতে খোঁড়াখুঁড়ি এড়ানো যায়।
আলু তোলার আগে হাম সরানোর কারণ হিসেবে মিসেনার লেট ব্লাইটজনিত কন্দপচা থেকে ক্ষতি কমানোর কথা বলেছিলেন। জাগো নিউজের নির্দেশিকার পরামর্শমতো আলু খোঁড়ার বেশ আগে হাম সরিয়ে ফেলা সেই ক্ষতি কমানোর জন্য মিসেনারের তালিকাভুক্ত পদক্ষেপগুলোর একটি।
আলু না কেটে, না থেঁতলে তোলা
আলু তোলার কাজ নিয়ে নির্দেশিকার কথা সহজ: কোদাল বা লাঙলের আঘাতে যেন আলু না কেটে যায়, সেদিকে লক্ষ রেখে সাবধানে মাটি খুঁড়তে হবে, আর তোলার সময় আলু যেন কেটে না যায় বা আঘাত না পায়। মিসেনারের ১৯৮২ সালের গবেষণাপত্র অনুযায়ী, কাটা ও থেঁতলানো জায়গা সদ্য তোলা আলু সংরক্ষণের সময় আর্দ্রতা হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ।
বাংলাদেশে এখনো বেশির ভাগ আলু হাতে খুঁড়ে তোলা হয়। আলু উৎপাদন যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে বারির ২০১৬ সালের দেশভিত্তিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভাবিত পাওয়ার টিলারচালিত আলু তোলার যন্ত্রের সঙ্গে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনা করা হয়। হাতে তুলতে হেক্টরপ্রতি ৬০ শ্রমদিবস লাগে, যন্ত্রে লাগে ২১ শ্রমদিবস; আর আলু তোলার খরচ প্রচলিত পদ্ধতিতে হেক্টরপ্রতি ১৭ হাজার ১০০ টাকা, যন্ত্রে ৮ হাজার ৩৫৭ টাকা। প্রতিবেদনে খরচ সাশ্রয় ৫১ শতাংশ ও শ্রম সাশ্রয় ৬৫ শতাংশ বলা হয়, আর যন্ত্রটির ক্ষমতা দিনে ১.২ হেক্টর। তবে প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়, এসব যন্ত্রের ব্যবহার খুব ধীরে বাড়ছিল, এবং ছোট ও খণ্ডিত জমির উপযোগী, কৃষকের সাধ্যের মধ্যে দামের ছোট আলু রোপণ ও আলু তোলার যন্ত্রের অভাবকে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
একই প্রতিবেদনে ২ হাজার ছোট আলু তোলার যন্ত্রের প্রয়োজন হিসাব করা হয় এবং এমন যন্ত্রের উপযোগী আলু উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে মুন্সীগঞ্জ, রাজশাহী, জয়পুরহাট, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, যশোর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও কুমিল্লার নাম উল্লেখ করা হয়।
আলু হাতে তোলা হোক বা যন্ত্রে, নাড়াচাড়া নিয়ে সম্প্রসারণ নির্দেশনা একই। ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির নির্দেশিকা অনুযায়ী, আলু চার থেকে ছয় ইঞ্চির বেশি উঁচু থেকে ফেলা উচিত নয়, আর যন্ত্রপাতির যে অংশে আলু পড়ে তাতে নরম আবরণ দেওয়া উচিত। থেঁতলানো কমানোর উপায় হিসেবে মৌসুমের শেষ দিকে সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং খোসা শক্ত হওয়ার জন্য সময়মতো লতা মেরে ফেলার কথাও এতে বলা হয়েছে।

আলু তোলার পর: রোদ নয়, ছায়া
আলু মাটি থেকে তোলার পর রোদে না রেখে ছায়ায় শুকানোর পরামর্শ দেয় নির্দেশিকা, আর সংগ্রহের পর যত দ্রুত সম্ভব বাড়িতে বা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বলে।
আলু আলো থেকে দূরে রাখার পেছনে সংরক্ষণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত কারণও আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের জনস্বাস্থ্য তথ্যসেবা মেডলাইনপ্লাস আলুগাছের বিষাক্ত উপাদান হিসেবে সোলানিনের নাম উল্লেখ করে জানায়, এটি পুরো গাছেই থাকে, বিশেষ করে সবুজ আলু ও নতুন অঙ্কুরে। সবুজ বা নষ্ট আলু না খাওয়া এবং অঙ্কুর ফেলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে মেডলাইনপ্লাস জানায়, বিষক্রিয়ার উপসর্গ, যা মূলত পাকস্থলী ও অন্ত্রে দেখা দেয়, খাওয়ার ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর দেখা দিতে পারে। সবুজ আলু বা অঙ্কুর খাওয়ার পর কেউ অসুস্থ বোধ করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আলু তোলার পর কীভাবে রাখা হয়, তার ওপর ফসলের কতটা টিকবে তা অনেকখানি নির্ভর করে। ইউএসএআইডি বাংলাদেশের অর্থায়নে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের হর্টিকালচার ইনোভেশন ল্যাবের সঙ্গে সিআইপি ২০১৩ সালে যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলায় একটি সংরক্ষণ পরীক্ষা চালায়। এতে কৃষকের বাড়িতে প্রচলিত স্বল্পমেয়াদি সংরক্ষণ, বারির নকশা করা সাধারণ তাপমাত্রার (অ্যাম্বিয়েন্ট) সংরক্ষণঘর, বাণিজ্যিক হিমাগার ও ছোট শীতলকক্ষের তুলনা করা হয়। দুই মাস পর বাড়িতে রাখা আলুর ওজন ২৫ শতাংশ এবং অ্যাম্বিয়েন্ট সংরক্ষণঘরে রাখা আলুর ওজন ১৫ শতাংশ কমে যায়, অথচ বাণিজ্যিক হিমাগারে রাখা আলুর ওজন কমে ২ শতাংশ, যার বেশির ভাগ প্রথম দুই সপ্তাহে; প্রকল্পটি একে কিউরিং ও ঠান্ডা হওয়ার সময়ের ওজন হ্রাস বলে ব্যাখ্যা করে। বাড়ি ও অ্যাম্বিয়েন্ট সংরক্ষণঘরে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে এক সপ্তাহের মধ্যেই অঙ্কুর গজাতে শুরু করে, কিন্তু বাণিজ্যিক হিমাগারে উল্লেখযোগ্য অঙ্কুরোদ্গম হয়নি।
সংরক্ষণক্ষমতা ও আলু উৎপাদনের পরিসর
নির্দেশিকাটি এমন সময়ে প্রকাশিত হয়, যখন আলুচাষিরা হিমাগারে জায়গার সংকট ও কম দামের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড ৫ লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। অধিদপ্তরের হিসাবে আগের মৌসুমে আলু উৎপাদিত হয়েছিল এক কোটি নয় লাখ টনের কাছাকাছি, আর দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার মনে করে হিমাগারের অভাবে মোট উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ আলু নষ্ট হয়, আর অধিদপ্তরের হিসাবে সে মৌসুমে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়ে ১৫ টাকা, যা আগের বছর ছিল ১৩ টাকা।
হিমাগার বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। বাংলাপিডিয়ায় দেশের হিমাগারগুলোর ধারণক্ষমতা প্রায় ২২ লাখ টন বলা হয়েছে; জ্ঞানকোষটি জানায়, বেশির ভাগ ক্ষুদ্র কৃষক, বিশেষ করে স্থানীয় জাতের আলু, বাড়িতে দেশীয় পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতেন, এবং পানি শুকিয়ে যাওয়া, পোকা ও রোগে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হতো। বারির ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে আলুর হিমাগারের সংখ্যা বলা হয়েছে ৩৮২টি, যেখানে উৎপাদিত আলুর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ রাখা যায়।
আঞ্চলিক হিসাবেও একই ঘাটতি দেখা যায়। ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা জানায়, বগুড়া ও রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে ৩৫ লাখ ৮০ হাজার ১৯১ টন আলু উৎপাদিত হয়, কিন্তু এই অঞ্চলের ১০৭টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা মাত্র ১৮ লাখ ৮৯ হাজার ৮২০ টন; বাকি আলু কৃষকেরা সনাতন পদ্ধতিতে রাখেন। বগুড়ার জেলা প্রশাসক পত্রিকাটিকে জানান, সে মৌসুমে জেলায় কাঠ ও বাঁশের ৬৭টি মাচায় আলু সংরক্ষণ করা হচ্ছিল, যার প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৩৫ টন।
২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ আলু উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে উল্লেখ করা মুন্সীগঞ্জের হিসাব থেকে বোঝা যায়, নির্দেশিকাটি কত বড় মৌসুমের জন্য লেখা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৩৪ হাজার ৬৫৫ হেক্টরে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল, আর আবাদ হয় ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ লাখ ৪৫ হাজার ১৯৫ টন। আগের মৌসুমে জেলায় ৩৪ হাজার ৭৫৮ হেক্টরে আলু চাষ হয়ে ফলন হয়েছিল প্রায় ১২ লাখ টন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সে মৌসুমে জেলায় ৬ হাজার ৭৮৩ হেক্টরে রপ্তানি উপযোগী আলুর আবাদ হয়েছে।
আলুর জাত ও তার পেছনের গবেষণা
নির্দেশিকায় আলু তোলার যে ভিন্ন ভিন্ন সময় বলা হয়েছে, তার পেছনে আছে দেশে চাষ হওয়া আলুর জাতের বৈচিত্র্য। বাংলাপিডিয়া এগুলোকে মোটা দাগে স্থানীয় ও উচ্চফলনশীল, এই দুই ভাগে ভাগ করে। জ্ঞানকোষটির হিসাবে প্রায় ২৭টি স্থানীয় জাত আছে; এগুলো কঠোর অর্থে দেশি নয়, বহু আগে এই অঞ্চলে আনা হয়েছিল, আর ফলন কম হলেও স্বাদ ও রান্নার গুণের জন্য এখনো চাষ হয়। এর মধ্যে আছে মূলত রংপুরে চাষ হওয়া শীলবিলাতী, বগুড়ার লালশীল, দিনাজপুর, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের লালপাকরী এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের দোহাজারী।
উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে বাংলাপিডিয়া নেদারল্যান্ডস থেকে আনা আয়তাকার, লালচে কন্দের জাত কার্ডিনাল, ফ্যাকাসে হলুদ কন্দের আরেক ডাচ জাত ডায়ামেন্ট এবং ভারত থেকে আনা লালচে, গোলাকার কুফরি সিন্দুরির নাম উল্লেখ করে। জ্ঞানকোষটি জানায়, ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বারির কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র পেরুর আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্রসহ বিভিন্ন উৎস থেকে বহু নতুন জাত সংগ্রহ করে বাংলাদেশের মাঠে পরীক্ষা করছে, এবং বারি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে বীজ আলুর খামার গড়ে তুলেছে। বারির ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে কেন্দ্রটির উদ্ভাবিত আলুর জাতের সংখ্যা বলা হয়েছে প্রায় ৭০টি, এবং বলা হয়েছে, ব্যবহৃত বীজের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ আসে মানসম্পন্ন উৎস থেকে, বাকি ৯৫ শতাংশ কৃষকের নিজের উৎপাদিত নিম্নমানের বীজ।
প্রতিটি জাত নিজের গতিতে পরিপক্ব হয় বলে কোনো নির্দিষ্ট জমির জন্য সবচেয়ে নিরাপদ নির্দেশক হলো জাতটির ঘোষিত পরিপক্বতার সময়, সঙ্গে মাঠের লক্ষণ: গাছ হলুদ হয়ে মরে যাওয়া, এরপর দুই থেকে তিন সপ্তাহ অপেক্ষা, এবং ঘষলে খোসা না ওঠা। নিজের জাতের পরিপক্বতার সময় নিয়ে, কিংবা হাম সরানো উচিত কি না এবং কীভাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হলে কৃষকেরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।
ছবি: কুউ পুলক / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ, আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্র (সিআইপি), কানাডিয়ান অ্যাগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং, হর্টিকালচার ইনোভেশন ল্যাব (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস), ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন, মেডলাইনপ্লাস (যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, বাসস





মন্তব্য
(০)